মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের নির্দেশ পুলিশ মহাপরিদর্শকের

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

দেশে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের নির্দেশ পুলিশ মহাপরিদর্শকের
ছবি: সংগৃহীত

দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্থিতিশীল রাখা এবং প্রতিটি নাগরিকের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপরাধ দমনে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন।

 

সমাজে কোনো অপরাধীর নির্দিষ্ট কোনো দলীয়, গোষ্ঠীগত বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনার ন্যূনতম কোনো সুযোগ নেই, আইনের চোখে তাদের একমাত্র পরিচয় তারা কেবলই অপরাধী-এমন অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ও কঠোর বার্তা প্রদান করে সারা দেশের পুলিশ বাহিনীকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির।

 

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত গত আগস্ট মাসের সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসিক মূল্যায়ন সভায় তিনি এই সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী নির্দেশনা প্রদান করেন।

 

দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে যখন বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় কিংবা দলীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার একটি সাধারণ অভিযোগ জনমনে প্রায়শই বিরাজ করে, ঠিক সেই সময়ে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তার এই ধরনের বলিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

 

এই নির্দেশনার ফলে মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের অনাকাঙ্ক্ষিত চাপের কাছে বিন্দুমাত্র নতি স্বীকার না করে সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সাথে আইন প্রয়োগে আরও বেশি উদ্যোগী হবেন বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে।

 

মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসবাদ এবং চাঁদাবাজির মতো গুরুতর ও সমাজ বিধ্বংসী অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার ওপর এই পর্যালোচনা সভায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়।

 

পুলিশ মহাপরিদর্শক অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশের যুবসমাজকে রক্ষা করতে পুলিশের ‘শূন্য সহনশীলতা’ বা আপসহীন নীতি অব্যাহত থাকবে এবং এর বাস্তবিক প্রয়োগ আরও কঠোর থেকে কঠোরতর করা হবে।

 

মাদকদ্রব্যের অবৈধ অনুপ্রবেশ, দেশব্যাপী বিস্তার, গোপন বিপণন এবং এর সাথে জড়িত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলোকে সম্পূর্ণভাবে সমূলে উৎপাটন করতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

তবে এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর না করে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ বৃদ্ধির ওপরও তিনি ব্যাপকভাবে জোর দিয়েছেন। পুলিশ মহাপরিদর্শক মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে সমাজ থেকে এই গভীর ব্যাধি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়, তাই সামাজিক পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও বেশি বেগবান করে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সক্রিয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

 

সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে সাথে নিয়ে একটি সুদৃঢ় সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই কেবল মাদকমুক্ত একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বড় বড় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত উঠতি বয়সী তরুণদের বিপথগামী হওয়া এবং কিশোর অপরাধের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি পুলিশের এই উচ্চপর্যায়ের সভায় অত্যন্ত গুরুত্ব ও উদ্বেগের সাথে আলোচিত হয়েছে।

 

উঠতি বয়সী তরুণরা বিভিন্ন নামে দল বা অপরাধী চক্র তৈরি করে পাড়া-মহল্লায় যে ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার অপচেষ্টা করছে, তা সমাজিক শৃঙ্খলার স্বার্থে কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

 

সভায় সভাপতিত্বকারী অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অভিযান) মো. সায়েদুর রহমান কিশোর অপরাধীদের দমনে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ কৌশল ও সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেন।

 

তিনি উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র বিপথগামী কিশোরদের আইনের আওতায় আনাই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের এই জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে নেপথ্য ইন্ধনদাতা হিসেবে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, স্বার্থান্বেষী মহল বা গডফাদার রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এবং গভীর গোয়েন্দা তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে।

 

যারা নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তরুণদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে তাদের অন্ধকার অপরাধ জগতে ঠেলে দিচ্ছে, সেই মূল হোতাদের চিহ্নিত করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য তিনি কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন।

 

কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এদিকে, সামনেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

 

এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব যেন সারা দেশে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে উদযাপিত হতে পারে, সেজন্য পুলিশ প্রশাসন এখন থেকেই দেশব্যাপী আগাম ও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে।

 

পুলিশ মহাপরিদর্শক মাঠপর্যায়ের সকল শাখাকে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে নিশ্ছিদ্র ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক প্রতিটি শাখাকে তাদের নিজ নিজ এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, পূজামণ্ডপের সংখ্যা এবং স্থানীয় সম্ভাব্য ঝুঁকি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে নিজস্ব ও স্বতন্ত্র নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করার নির্দেশ দেন।

 

উৎসবের সময় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার যেকোনো হীন অপচেষ্টা নস্যাৎ করতে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

বিশেষ করে, সাইবার জগতে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যেন ভুয়া খবর, গুজব বা বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি বা দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধ দমন বিভাগগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

 

পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিজস্ব জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির বিষয়েও এই পর্যালোচনা সভায় বিস্তারিত আলোচনা ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

 

অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. সায়েদুর রহমান মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময় সকল পুলিশ সদস্যকে তাদের পোশাকে পরিধেয় আধুনিক ক্যামেরা বাধ্যতামূলকভাবে এবং যথাযথভাবে ব্যবহার করার নির্দেশ দেন।

 

এই প্রযুক্তিগত সংযোজন একদিকে যেমন সাধারণ নাগরিকদের সাথে পুলিশের আচরণগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে তেমনি যেকোনো মিথ্যা অভিযোগ থেকে পুলিশ সদস্যদের রক্ষা করতে এবং অপরাধের বাস্তব প্রমাণ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সামাজিক পুলিশিং ব্যবস্থাকে কেবল কাগুজে কাঠামোতে সীমাবদ্ধ না রেখে একে সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন।

 

সাধারণ জনগণের সাথে পুলিশের দূরত্ব কমিয়ে এনে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি করার মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান সহজতর করার কথা বলা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ মাত্রায় পেশাদারিত্ব, সততা ও নৈতিকতা বজায় রাখার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।

 

দীর্ঘ এই সভায় গত আগস্ট মাসের দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। এ সময় সারা দেশে সংঘটিত ডাকাতি, দস্যুতা, চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।

 

এছাড়া, দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং অপহরণ মামলার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়েও সভায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং এসব ক্ষেত্রে জড়িত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে কঠোর আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়।

 

সভায় বিভিন্ন থানায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বা মুলতবি থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি, আদালত কর্তৃক জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল করার হার বৃদ্ধি এবং চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয়।

 

পাশাপাশি, আদালতে পুলিশের জমা দেওয়া অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করার হার কীভাবে আরও বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের আরও বেশি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।

 

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মাসিক পর্যালোচনা সভায় ঢাকা মহানগরসহ সকল মহানগরীর পুলিশ কমিশনার, বিভিন্ন রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক এবং সকল জেলার পুলিশ সুপাররা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অনলাইনে সংযুক্ত ছিলেন।

 

অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তর প্রান্তে অপরাধ ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানসহ ঊর্ধ্বতন এবং সংশ্লিষ্ট পদস্থ কর্মকর্তারা সশরীরে উপস্থিত থেকে এই নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নেন।