গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বয়ং উপস্থিত থেকে এই জাতীয় ও আঞ্চলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
এই বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন অত্র অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের ধরন অনুযায়ী জানা যায়, সরকারপ্রধান এদিন রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে ফেনীর উদ্দেশে যাত্রা করেন।
দীর্ঘ যাত্রাপথ শেষে তিনি যখন নির্ধারিত অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছান, তখন সেখানে এক উৎসবমুখর, আবেগঘন এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ফেনী-১ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু সরকারের শীর্ষ পদাধিকারীকে অত্যন্ত উষ্ণ, আন্তরিক ও আড়ম্বরপূর্ণ অভ্যর্থনা জানান।
স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দলীয় নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অথচ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল উপস্থিতিতে পুরো এলাকা একটি রাষ্ট্রীয় গাম্ভীর্য ও নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র চাদরে ঢাকা ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের মধ্যেও এক ধরনের প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়েছে, কারণ এই প্রকল্পটি তাদের প্রাত্যহিক জীবন, নিরাপত্তা ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি এবং গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেনী জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরামের অন্তর্গত খেয়াঘাট মুহুরী ব্রিজ এলাকায় উপস্থিত হন। সেখানে তিনি অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটির নামফলক উন্মোচন করেন।
এই মুহুরী নদীর তীরবর্তী এলাকাটি ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে ফেনী জেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ফলক উন্মোচনের পরক্ষণেই তিনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দেশব্যাপী সবুজায়ন কর্মসূচির প্রতি বর্তমান সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের একটি দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে সেখানে একটি বৃক্ষরোপণ করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় এবং নদীর তীরের ভূমিক্ষয় রোধে এই ধরনের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক বার্তা বহন করে। বৃক্ষরোপণ পর্ব শেষে তিনি মুহুরী নদীর হারানো নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধামুক্ত রাখতে অত্যন্ত সময়োপযোগী ‘নদী খনন কর্মসূচি’ বা ড্রেজিং কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
নদী খনন বা ড্রেজিং কর্মসূচির উদ্বোধন এই বহুমুখী প্রকল্পের অন্যতম একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ। ঐতিহাসিকভাবেই ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলা উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক বন্যার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি জনপদ।
মুহুরী ও কহুয়া নদীর তলদেশে বছরের পর বছর ধরে প্রচুর পরিমাণে পলি জমে নদীর নাব্যতা ও গভীরতা চরমভাবে হ্রাস পেয়েছিল। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি বা উজানের ঢলে নদীর পানি খুব সহজেই দুকূল ছাপিয়ে তীরবর্তী বিস্তীর্ণ জনপদ, হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি, গবাদিপশু এবং মানুষের বসতবাড়ি তলিয়ে দিত, যা প্রতি বছরই এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনত।
নদী খননের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এবং সফলভাবে সমাপ্ত হলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, যা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিকে অনেকাংশেই প্রশমিত করবে বলে নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এই সুদূরপ্রসারী প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের জন্য একটি আধুনিক ও টেকসই সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ফেনী অঞ্চল মূলত একটি কৃষিনির্ভর এলাকা এবং এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো ধান ও অন্যান্য রবিশস্যের ব্যাপক চাষাবাদ।
কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকটের কারণে কৃষকরা তাদের আবাদি জমিতে ফসল ফলাতে ব্যাপকভাবে বাধার সম্মুখীন হতেন। মুহুরী-কহুয়া সেচ প্রকল্পের এই পুনর্বাসন কাজ সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত হলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ধরে রেখে তা সরাসরি সেচের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
এর ফলে হাজার হাজার হেক্টর পতিত ও অনাবাদি জমি নতুন করে সারা বছরব্যাপী চাষাবাদের আওতায় আসবে, বহুমুখী ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকদের জীবনযাত্রার মানে এক অভাবনীয়, দীর্ঘস্থায়ী ও ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হবে।
এটি কেবল কৃষকদেরই স্বাবলম্বী ও আর্থিকভাবে সচ্ছল করবে না, বরং সমগ্র দেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায়ও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অবদান রাখবে। এই প্রকল্পের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিষ্কাশন বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এই অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘস্থায়ী জলবদ্ধতা একটি নৈমিত্তিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবদ্ধ পানি কেবল ফসলেরই ক্ষতি করে না, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও চরম হুমকি স্বরূপ।
আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার প্রয়োগ ঘটিয়ে এই প্রকল্পের আওতায় পানিনিষ্কাশনের যে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে ফেলে কৃষিজমি ও লোকালয়কে নিরাপদ রাখবে।
এই ধরনের সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাগুলোর সঙ্গেও সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি সমন্বিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুষম উন্নয়নের স্পষ্ট বার্তা দিতে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যা এই প্রকল্পটির জাতীয় গুরুত্বকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
অনুষ্ঠানমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে উপস্থিত ছিলেন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য ভিপি জয়নাল আবেদীন এবং ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বর্তমান সরকারের পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, যার মন্ত্রণালয় সরাসরি এই নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের সার্বিক তত্ত্বাবধান, নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নিয়োজিত রয়েছে।
উদ্বোধনী এই ঐতিহাসিক মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন সরকারের গৃহায়ন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা।
এত বিপুল সংখ্যক মন্ত্রিপরিষদ সদস্য এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের কল্যাণকে কতটা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যৌথ সমন্বয়ে গৃহীত এই প্রকল্প কেবল একটি সাধারণ অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, বরং এটি পরিবেশগত স্থায়িত্ব, নদীর বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি অনন্য রাষ্ট্রীয় দৃষ্টান্ত।
পরিবেশমন্ত্রী এবং পানিসম্পদ মন্ত্রীর একযোগে উপস্থিতি এই প্রকল্পের পরিবেশবান্ধব ও যুগোপযোগী পানি ব্যবস্থাপনার দিকটিকে আরও বেশি সুসংহত ও দৃশ্যমান করার সরকারি সদিচ্ছাকেই অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রতিফলিত করে।
সমাজকল্যাণ ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক সুরক্ষা ও বাসস্থানের নিরাপত্তায় সরকারের সামগ্রিক ও কল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গির অকাট্য প্রমাণ বহন করে।
পরিশেষে অত্যন্ত সুনিশ্চিতভাবে বলা যায়, ফেনীর মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের এই সুবিশাল পুনর্বাসন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন কেবল একটি প্রথাগত সরকারি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি অত্র অঞ্চলের লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম এবং একটি উন্নত জীবনের প্রত্যাশার প্রতি রাষ্ট্রের এক চূড়ান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও দাতা সংস্থাগুলোও নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা রক্ষা এবং কৃষির জন্য টেকসই সেচ ব্যবস্থার এমন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে সর্বদা বিশ্বব্যাপী সাধুবাদ জানিয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দেশের প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমান স্থায়ীভাবে উন্নয়নে যে সময়োপযোগী, সুপরিকল্পিত ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, মুহুরী-কহুয়া নদীর এই বিশাল প্রকল্পটি তারই এক উজ্জ্বল, অনুকরণীয় ও সফল দৃষ্টান্ত হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে।
এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ফেনী জেলা আগামী দিনে কৃষি, অর্থনীতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এক নতুন, নিরাপদ ও সমৃদ্ধশালী যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যা সমগ্র বাংলাদেশের অন্যান্য নদীমাতৃক ও বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোর জন্য একটি অনুসরণীয় উন্নয়ন মডেল হিসেবে পরিগণিত হবে।