বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১, ২০২৬
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যৌথ অভিযানের আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৭ এএম

যৌথ অভিযানের আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র তেজগাঁও এলাকায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের শুভারম্ভ ফলক উন্মোচন শেষে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতি, নাগরিক নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য যৌথ অভিযান নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া নানা জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করেন যে, দেশব্যাপী নতুন করে কোনো আনুষ্ঠানিক যৌথ অভিযান পরিচালনার বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।

 

তবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দৈনন্দিন ও নিয়মিত কার্যক্রম অত্যন্ত জোরালোভাবে চলমান রয়েছে।  আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের মতোই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেন।

 

তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিস্তারিতভাবে জানান, বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, এসআরবি এবং বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক, যৌক্তিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া।

 

দেশে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা, সন্ত্রাসবাদ দমন, বেপরোয়া চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ বিস্তার রোধে এই সমন্বিত অভিযান প্রতিনিয়তই পরিচালিত হচ্ছে।

 

দেশের আপামর জনসাধারণের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার এই নিয়মিত কার্যক্রমগুলোকে আগামী দিনগুলোতে আরও আধুনিক, সময়োপযোগী এবং শক্তিশালী করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

 

ফলশ্রুতিতে, সাধারণ মানুষের মনে কোনো ধরনের আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির ন্যূনতম অবকাশ নেই বলে তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার সমুন্নত রেখেই এই সকল অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলেও পরোক্ষভাবে তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়।

 

এই ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত একটি যৌক্তিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, একটি সুপরিকল্পিত, আধুনিক এবং কৌশলগতভাবে উপযুক্ত স্থানে নিজস্ব সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য আনসার বাহিনীর যে দীর্ঘদিনের ঐকান্তিক দাবি ছিল, তা অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে।

 

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় আনসার বাহিনীর নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের জন্য রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থানে তিন দশমিক চার দুই আট একর বা প্রায় এগারো বিঘা মূল্যবান জমি আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।

 

বর্তমানে খিলগাঁও এলাকায় অবস্থিত আনসার সদর দপ্তরের অপরিসর জায়গা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাহিনীর দৈনন্দিন প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানাবিধ স্থবিরতা ও যাতায়াতগত প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছিল।

 

এই সমস্ত দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতা ও স্থবিরতা দূর করার লক্ষ্যে তেজগাঁওয়ের এই সুবিশাল নিজস্ব জমিতে একটি বিশ্বমানের, আধুনিক এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সংবলিত বৃহৎ অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে, যা বাহিনীর ভবিষ্যৎ পথচলাকে আরও সুগম ও গতিশীল করবে।

 

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিশাল জনবল এবং তাদের অপরিসীম রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের কথা স্মরণ করে মন্ত্রী অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব পালনে প্রায় বিশ হাজার ব্যাটালিয়ন আনসার এবং ষাট হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্য অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

 

এর পাশাপাশি সমগ্র দেশজুড়ে পঁয়ত্রিশ হাজার গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের নেতা ও নেত্রীর সুযোগ্য ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রায় ষাট লাখ প্রশিক্ষিত জনশক্তি সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। নিয়মিত এবং অনিয়মিত সদস্যের এই বিশাল পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টিপাত করলে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বর্তমানে দেশের সর্ববৃহৎ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

 

দেশের যেকোনো জাতীয় দুর্যোগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই বাহিনীর সদস্যরা তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণের নিরলস সেবা করে আসছেন।

 

বাহিনীর সদস্যদের সার্বিক জীবনমান উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট নিরসনের বিষয়েও বর্তমান সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আন্তরিক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্যদের আবাসন সমস্যা একটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ও কষ্টদায়ক বিষয় ছিল।

 

এই প্রকট আবাসন সংকট স্থায়ীভাবে নিরসনকল্পে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে তেজগাঁওয়ের নতুন সদর দপ্তরে অত্যাধুনিক আবাসিক কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি ঢাকার আশুলিয়া এবং শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত সৈনিক নিবাসে স্থান সংকুলানের জন্য অতিরিক্ত ও যুগোপযোগী সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

 

জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের বিভিন্ন জাতীয় সংকটকালীন মুহূর্তে এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর অসামান্য অবদান, পেশাদারত্ব এবং আত্মত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।

 

একইসঙ্গে, বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন যৌক্তিক, আর্থিক এবং অন্যান্য পর্যায়ক্রমিক দাবি-দাওয়াগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব ও সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করে তা ধাপে ধাপে পূরণে বর্তমান সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার তিনি পুনরায় ব্যক্ত করেন।

 

দেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার বিষয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন মনোভাব প্রদর্শন করেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, কোনো বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে যদি দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র অবহেলা অথবা কোনো ধরনের বেআইনি, দুর্নীতি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে অতীত প্রথার মতো কেবল কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহারের মতো লঘু শাস্তি প্রদান করা হবে না।

 

বরং, অপরাধের মাত্রা ও ধরন বিবেচনায় নিয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সরকার যে নিজ বাহিনীর কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না, এই শক্ত বার্তাটি তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জাতির সামনে তুলে ধরেন।

 

পাশাপাশি, আসন্ন ডিসেম্বর মাসকে বাংলাদেশের মহান বিজয়ের মাস ও জাতীয় গৌরবের মাস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, এই আবেগঘন ও ঐতিহাসিক মাসে কোনো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রবিরোধী কুচক্রী মহল, অথবা কোনো অপশক্তি দেশের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের অরাজকতা, অস্থিরতা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড তৈরি করার দুঃসাহস দেখালে তাদের অত্যন্ত কঠোর হস্তে ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দমন করা হবে।

 

পরিশেষে, রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এবং অন্যতম প্রধান সমস্যা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বা যানবাহন নিয়ন্ত্রণ নিয়েও মন্ত্রী সরকারের নেওয়া নতুন, বিজ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপগুলোর কথা বিস্তারিতভাবে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।

 

তিনি জানান, ঢাকা শহরের অসহনীয় যানজট নিরসন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনাকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত সফলভাবে চালু করা হয়েছে।

 

এই অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের মানবিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, যার ফলে রাস্তায় যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে একটি নতুন ধরনের শৃঙ্খলা, সতর্কতা ও জবাবদিহিতা ফিরে আসতে শুরু করেছে।

 

এছাড়া, নগরীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের রাস্তা খনন এবং নির্মাণ কাজের কারণে সাধারণ নগরবাসীকে যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনাকাঙ্ক্ষিত যানজট এবং জনদুর্ভোগের শিকার হতে না হয়, সে বিষয়েও তিনি সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

 

উন্নয়নমূলক কাজের জন্য কোনো একটি ব্যস্ত পুরো রাস্তা একসঙ্গে খনন না করে, সেটিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার এবং অবিলম্বে সেই ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলো পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে পুনরায় যানবাহন চলাচলের সম্পূর্ণ উপযোগী করে তোলার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

সরকারের এই বহুমুখী, সুপরিকল্পিত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলো দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক, নিরাপদ ও গতিশীল করে তুলতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে।