পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ঐতিহাসিক এই মেগা প্রকল্পে জ্বালানি বহনের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নিয়মকানুন ও দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় এই চালানটি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়।
শনিবার দুপুরে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে এই চালান পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য আনা প্রথম ইউরেনিয়ামের এই চালানটি সব ধরনের নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রবেশ করে।
এর আগে শুক্রবার রাতে রাশিয়া থেকে উৎপাদিত পারমাণবিক জ্বালানি বহনকারী বিশেষ কার্গো বিমানটি রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরবর্তীতে যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শনিবার সকালে তিনটি বিশেষ ভারী লরির সমন্বয়ে গঠিত একটি কঠোর নিরাপত্তার বহর ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা ত্যাগ করে পাবনার রূপপুরের উদ্দেশে রওনা হয়।
পুরো পথিমধ্যে অত্যন্ত নিখুঁত ও সতর্ক ট্রাফিক এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা হয়। এই সংবেদনশীল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তায় দেশের সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত এই নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশ নেয় পুলিশের স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি, সাধারণ পুলিশ বাহিনী এবং দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষায়িত সদস্যরা।
প্রকল্প এলাকার আশপাশেও নেওয়া হয়েছিল বহুমুখী ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যাতে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়। আন্তর্জাতিক মানের এই নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুনরায় দৃঢ় প্রতিশ্রুতির পরিচয় দিয়েছে।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, এই ইউরেনিয়ামের চালানটি মূলত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে এসে পৌঁছানোর প্রাথমিক সময়সূচি নির্ধারিত ছিল। তবে আন্তর্জাতিক আকাশপথের জটিলতা এবং ইউরেনিয়াম বহনকারী বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজটি নির্দিষ্ট রুটে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের ট্রানজিট বা অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত সেই সময়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও রুট পরিবর্তনের মাধ্যমে জটিলতার সমাধান করা হয়, যার ফলে সফলভাবে জ্বালানি বহনকারী বিমানটি ঢাকায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৩ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য প্রথম দফার পারমাণবিক জ্বালানি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে এসে পৌঁছেছিল। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আন্তর্জাতিক মান যাচাইয়ের পর চলতি বছরের মে মাসে সেই প্রথম দফার জ্বালানি অত্যন্ত সফলভাবে পারমাণবিক চুল্লিতে স্থাপন করা হয়।
বর্তমানে সেই ইউনিটের কমিশনিং ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, খুব শীঘ্রই এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের জাতীয় গ্রিডে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।
পাবনার ঈশ্বরদীর পদ্মার তীরে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল প্রযুক্তিগত প্রকল্পগুলোর একটি। বারোশ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন দুটি পৃথক ইউনিটের মাধ্যমে এই কেন্দ্র থেকে সম্মিলিতভাবে মোট চব্বিশ শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জিত হবে।
রাশিয়া সরকারের আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সরাসরি সহযোগিতায় ২০১৩ সালে এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। রাশিয়া এবং বাংলাদেশের যৌথ অংশীদারিত্বে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয় এক লক্ষ তেরো হাজার কোটি টাকার অধিক নির্ধারিত হয়েছে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর মধ্য দিয়ে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার বড় একটি অংশ মেটানোর পাশাপাশি শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে বলে নীতিনির্ধারকরা আশা করছেন।