বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে, ফেনী জেলার ফুলগাজী, পরশুরাম এবং ছাগলনাইয়া উপজেলায় স্থাপিত দেশের প্রথম এই বৃহৎ পরিসরের সরকারি রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি স্থাপনাগুলো নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে সক্ষম হবে, যা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে ফুলগাজীর জেলা পরিষদ ডাকবাংলো প্রাঙ্গণ থেকে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে এই সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মানদণ্ডে বিচার করলে, স্থানীয় সম্পদের এমন সুপরিকল্পিত ব্যবহার একটি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার অন্যতম নিদর্শন। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সরবরাহকৃত আনুষ্ঠানিক তথ্যানুযায়ী, তিন উপজেলার বিভিন্ন সরকারি ভবনের ছাদে স্থাপিত দেশের প্রথম এই সমন্বিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে মোট ৯৬২ দশমিক ৫ কিলোওয়াট বা প্রায় শূন্য দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে।
এই আধুনিক প্রযুক্তিটি মূলত 'নেট মিটারিং' ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমেই সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাত্যহিক নিজস্ব চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হবে।
ছুটির দিনগুলোতে অথবা দিনের বেলায় যখন বিদ্যুতের ব্যবহার তুলনামূলক কম থাকবে, তখন অব্যবহৃত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। প্রকল্পটির আওতায় এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফুলগাজী উপজেলার আটটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে উপজেলা পরিষদ ভবন, জেলা পরিষদ ডাকবাংলো এবং ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদ ভবন।
শুধুমাত্র ফুলগাজী উপজেলাতেই মোট ২৪৯ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকাঠামো প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের প্রতিটির ছাদে প্রায় ২৫ কিলোওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার আধুনিক মানের সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে।
অন্যদিকে, উপজেলা পরিষদ ভবনে স্থাপিত সিস্টেমটির সক্ষমতা সর্বাধিক, যা প্রায় ১০৩ কিলোওয়াট। পাশাপাশি, ছাগলনাইয়া উপজেলায় এই প্রকল্পের বিস্তার আরও ব্যাপক। সেখানে উপজেলা পরিষদ ভবন, পৌরসভা ভবন, স্থানীয় ডাকবাংলো এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের প্রশস্ত ছাদসহ মোট ১২টি স্থাপনাকে এই সৌরবিদ্যুৎ কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
বিশাল এই কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে ছাগলনাইয়া উপজেলার স্থাপনাগুলোতে মোট ৪১৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। সরকারি ভবনগুলোর অব্যবহৃত ছাদ, যা বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়েছিল, তা এখন পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক একটি মিনি পাওয়ার প্ল্যান্টে পরিণত হয়েছে।
এই সোলার সিস্টেম স্থানীয় পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইভাবে, পরশুরাম উপজেলায়ও এই নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে।
এই উপজেলায় উপজেলা পরিষদ ভবন, স্থানীয় অডিটোরিয়াম ভবন, তিনটি ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এবং জেলা পরিষদ ডাকবাংলোসহ মোট ছয়টি সরকারি স্থাপনায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে।
পরশুরামের এই স্থাপনাগুলো থেকে মোট ২৯৮ দশমিক ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অডিটোরিয়ামের মতো বৃহৎ স্থাপনার বিশাল ছাদকে কাজে লাগানোর এই কৌশলটি প্রকৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সময়োপযোগী।
তিনটি উপজেলার এই সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ওপর স্থানীয় বিদ্যুতের যে চাপ রয়েছে, তা অনেকাংশেই লাঘব করতে সক্ষম হবে। দেশের জ্বালানি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সার্বিক দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (আরইবি)।
প্রকল্পটি অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হলেও এর মোট ব্যয়ের একেবারে সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত হিসাব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. নুরুল হোসাইন প্রকল্পটির আর্থিক দিক সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন।
তার মতে, তিনটি উপজেলায় এই বিপুল পরিমাণ সৌর প্যানেল স্থাপন, ইনভার্টার সংযোজন এবং নেট মিটারিং সিস্টেম চালুকরণসহ পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক ৫ থেকে সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশে এমন একটি প্রকল্পের সফল উদ্বোধন প্রমাণ করে যে, দেশটি ধীরে ধীরে সবুজ জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ফেনীর এই রুফটপ সোলার প্রজেক্টটি একটি মডেল প্রকল্প হিসেবে কাজ করবে, যা দেশের অন্যান্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অনুকরণীয় হতে পারে। সমগ্র দেশের সকল সরকারি ভবনের ছাদগুলোকে যদি পর্যায়ক্রমে এমন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় আনা যায়, তবে জাতীয় গ্রিডে বিপুল পরিমাণ পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর এই ফেনী সফরটি কেবল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল ওই অঞ্চলের সার্বিক কাঠামোগত ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের এক বিস্তৃত রূপরেখার অংশ। এদিন দুপুর আড়াইটার দিকে পরশুরামে তিনি 'মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প'-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফেনী অঞ্চলটি প্রায়শই পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার শিকার হয়, যা স্থানীয় কৃষি ও জনজীবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে। মুহুরী-কহুয়া নদীর তীরবর্তী মানুষদের দীর্ঘদিনের দুর্দশা লাঘবে এই বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় জনগণের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধা-অসুবিধার কথা শোনেন। এরপর তিনি পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফুলগাজীর বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
বিকেলের দিকে তার কর্মসূচির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে এক সমাবেশের মাধ্যমে তিনি সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষক কার্ড বিতরণ করেন।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণের এই উদ্যোগ স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে একই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের মাঝে বিশেষ সম্মানী প্রদান কর্মসূচিতেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে যারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের এই স্বীকৃতি এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া থেকে শুরু করে বন্যা নিয়ন্ত্রণের মতো অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের হাতে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার এই নানামুখী উদ্যোগ ফেনী জেলার সামগ্রিক উন্নয়নে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।