তিনি অভিযোগ করেছেন যে, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে এবং উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে বিতাড়িত স্বৈরাচারী শক্তি এবং দীর্ঘদিনের গুপ্ত রাজনৈতিক অপশক্তি আবারও একই সমান্তরালে এসে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে, ফেনী জেলার ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত এক বিশাল ও জনবহুল সমাবেশে প্রধান অতিথির দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
তাঁর এই বক্তব্যে একদিকে যেমন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্ধকারের দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী জনকল্যাণমূলক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখাও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সরকারের উন্নয়নমূলক দর্শনের একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে।
সমাবেশে উপস্থিত হাজারো জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিগত বছরগুলোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন।
তিনি বলেন, দেশের আপামর ছাত্র-জনতার তীব্র গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথাতেই দেশের মানুষ একটি অত্যন্ত বিস্ময়কর রাজনৈতিক জোটের আত্মপ্রকাশ লক্ষ্য করেছে।
যে গুপ্ত বাহিনী দীর্ঘকাল ধরে আড়ালে থেকে রাজনীতি করেছে, তারা হঠাৎ করেই প্রকাশ্যে এসে ঘোষণা দিয়েছে যে পলাতক স্বৈরাচারী শক্তির লোকজন যদি দেশে ফিরে আসে এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাতে তাদের কোনো ধরনের আপত্তি নেই।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঐক্যের পেছনের ঐতিহাসিক কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই দুই শক্তির মধ্যে কোনো আদর্শিক বিরোধ কখনোই ছিল না; বরং তারা বরাবরই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে।
তিনি রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে প্রমাণস্বরূপ উল্লেখ করেন যে, ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, ১৯৯১ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এমনকি বিগত বছরগুলোর সমস্ত প্রহসনের নির্বাচনেও এই দুই অপশক্তি সর্বদা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে।
প্রকাশ্যে তারা ভিন্ন মেরুর কথা বললেও, পর্দার অন্তরালে তারা সব সময়ই একই স্বার্থের সুতোয় গাঁথা ছিল এবং জনগণের অধিকার হরণের ক্ষেত্রে তারা তলে তলে একসঙ্গেই কাজ করেছে। আর ঠিক এ কারণেই সচেতন জনগণ তাদেরকে 'গুপ্তশক্তি' হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে।
বিগত প্রায় দেড় যুগের রাজনৈতিক নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছর ধরে দেশে যখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম চলছিল, তখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অগণিত নেতাকর্মী চরম রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে অন্যায়ভাবে কারাবরণ করতে হয়েছে, মিথ্যা ও গায়েবি মামলার ঘানি টানতে হয়েছে এবং অনেককে গুম ও হত্যার শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশের মানুষ কি কখনো শুনেছে যে ওই গুপ্ত রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা বা কর্মী এ ধরনের রাষ্ট্রীয় জুলুমের শিকার হয়েছেন?
যখন সাধারণ মানুষ এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নেমেছিলেন, দিনের পর দিন হরতাল, মিছিল এবং মিটিং করে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, তখন ওই সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর কাউকেই রাজপথের ধারেকাছেও দেখা যায়নি।
তারা সব সময়ই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে স্বৈরাচারের নীরব সহযোগী হিসেবে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে। বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সরকার অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, দেশের একটি ক্ষুদ্র স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে একটি পরিকল্পিত অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরির গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
তারা ভিত্তিহীনভাবে 'এক দফা' আন্দোলনের নামে রাজপথ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন রাখেন যে, বর্তমান সরকার দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য যে যুগান্তকারী কর্মসূচিগুলো গ্রহণ করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে প্রকৃতপক্ষে কাদের উপকার হবে?
তিনি নিজেই এর উত্তর দিয়ে বলেন, এই কর্মসূচিগুলো সফল হলে এর একমাত্র এবং চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হবে দেশের সাধারণ, খেটে খাওয়া এবং প্রান্তিক আয়ের মানুষেরা। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর গঠনমূলক কর্মসূচির অভাবের তীব্র সমালোচনা করে সরকারপ্রধান বলেন, যারা আজ দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে, যারা জনগণের অধিকার হরণ করে দেশ থেকে পালিয়েছে, তাদের কাছে সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য আদৌ কি কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা কর্মসূচি রয়েছে?
তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করেন, ওইসব দলের ইশতেহারে কি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য 'ফ্যামিলি কার্ড' প্রদানের কোনো পরিকল্পনা আছে? কৃষকদের সুরক্ষার জন্য 'কৃষক কার্ড' বা দেশের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে খাল খননের মতো কোনো বাস্তবসম্মত কর্মসূচি কি তাদের আছে?
পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ, কিংবা প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ৫০ শয্যা থেকে উন্নত করে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার কোনো ভিশন কি তাদের রাজনীতিতে কখনো ছিল?
এমনকি সমাজের নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে যারা নিরলস কাজ করেন, সেই সম্মানিত ইমাম ও মুয়াজ্জিন সাহেবদের রাষ্ট্রীয় সম্মানী প্রদানের কোনো চিন্তাও তাদের মাথায় নেই। সুতরাং, যাদের কাছে জনগণের জন্য কোনো কল্যাণমূলক কর্মসূচিই নেই, তারা মূলত কিসের রাজনীতি করছে, সেই প্রশ্নটি তিনি জাতির বিবেকের কাছে অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করেন।
দেশের অর্থনৈতিক উত্তরণ এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বর্তমান সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষ এখন তাদের ভাগ্যের একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চায়। কেউই অনন্তকাল ধরে অভাব আর দুর্দশার মধ্যে জীবনযাপন করতে চায় না।
সরকার গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে, একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমেই এই পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই লক্ষ্যের অংশ হিসেবেই বর্তমান সরকার দেশব্যাপী অভাবগ্রস্ত পরিবারগুলোর মা-বোনদের হাতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়ার বিশাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
পাশাপাশি, সমাজের সম্মানিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, বিশেষ করে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় সম্মানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি যে কৃষক সমাজ, তাদের জীবনমান উন্নত করতে এবং কৃষিকাজকে লাভজনক পেশায় পরিণত করতে কৃষক কার্ড প্রবর্তন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এই সহায়তাগুলো যখন দেশের প্রতিটি প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে, তখন ধীরে ধীরে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। তৃণমূলের এই মানুষগুলো যখন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে, ঠিক তখনই সমগ্র বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল এবং স্বনির্ভর অর্থনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, যারা ধর্মের অপব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়, তাদের সম্পর্কে দেশের প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে সচেতন হতে হবে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিগত একটি নির্বাচনের আগে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বেহেশতের টিকিট বিক্রির মতো চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের উল্লেখ করে বলেন, বেহেশত এবং দোজখের একমাত্র মালিক হলেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। যে ক্ষমতা এবং অধিকার নিরঙ্কুশভাবে কেবল মহান আল্লাহর, সেই ক্ষমতা যদি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের বলে দাবি করে, তবে তা সম্পূর্ণভাবে 'শিরক' বা আল্লাহর সঙ্গে শরিক করার মতো ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, যারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে নাফরমানি ও শিরক করতে পারে, তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যে কত বড় মানের মুনাফিকি বা প্রতারণা করতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
তাই এ ধরনের ধর্মব্যবসায়ী এবং গুপ্ত রাজনীতির ধারকদের থেকে দেশবাসীকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার এবং তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ থাকার পরামর্শ দেন তিনি। পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেন যে, বর্তমান সরকার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কথায় নয়, বরং কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে তারা সব সময় জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করে।
বিএনপি অতীতে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সব সময় সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই তাদের যাবতীয় নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন করে থাকে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরটি কেবল রাজনৈতিক সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একগুচ্ছ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের এক বর্ণাঢ্য শুভ সূচনা। সমাবেশের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী প্রতীকীভাবে বেশ কয়েকজন সুবিধাভোগীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড তুলে দেন এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্রীয় সম্মানীর অর্থ প্রদান করেন।
জনসভা সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি ফুলগাজীর জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর ছাদে স্থাপিত রুফটপ সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার যুগান্তকারী কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
এর আগে, এদিন দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি পরশুরাম উপজেলায় আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢল মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প'-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে আন্তরিকভাবে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এছাড়া পরিবেশ রক্ষার এক সুমহান বার্তা ছড়িয়ে দিতে তিনি ফুলগাজীর বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বহুমুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ফেনী অঞ্চলের মানুষের মাঝে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।