শনিবার, অক্টোবর ৩, ২০২৬
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনাকে আকস্মিক আশ্রয় দেওয়া ছাড়া ভারতের কাছে কোনো বিকল্প ছিল না

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম

শেখ হাসিনাকে আকস্মিক আশ্রয় দেওয়া ছাড়া ভারতের কাছে কোনো বিকল্প ছিল না
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ও যুগান্তকারী দিন ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

সেই ঐতিহাসিক ও চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে তাকে ভারতে আশ্রয় প্রদান করা নিয়ে বিগত সময়গুলোতে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অঙ্গনে নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হয়েছে।

 

এবার সেই বহুল আলোচিত প্রসঙ্গের ওপর অত্যন্ত খোলামেলা ও স্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, উদ্ভূত সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়া ছাড়া ভারতের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।

 

শনিবার, ৩ অক্টোবর, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ ‘পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর একটি বিশেষ অধিবেশনে উপস্থিত সুধীজন ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। দেশ-বিদেশের শীর্ষ কূটনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিতে এই সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে গভীর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের ও মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনারের এই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য স্বভাবতই গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন যত দ্রুতই হোক না কেন, রাষ্ট্রীয় কূটনীতির নিজস্ব কিছু আইনি নিয়ম ও আন্তর্জাতিক প্রোটোকল থাকে, যা কোনো রাষ্ট্র চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে পারে না।

 

কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণের কথা উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, যে মুহূর্তে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রোটোকল অনুযায়ী তখন পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের বৈধ ও ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী।

 

একজন সরকারপ্রধান যখন চরম বিপর্যয়ের মুখে প্রতিবেশী কোনো দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করেন, তখন তাকে ফিরিয়ে দেওয়া কূটনৈতিক ও মানবিক-উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার।

 

দীনেশ ত্রিবেদী অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে সেই দিনটির স্মৃতিচারণ করে বলেন, ভারত সরকার বা দিল্লির নীতিনির্ধারকরা এই আকস্মিক ঘটনার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না।

 

পরিস্থিতি এতটাই দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছিল যে, ভারত সরকারও তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে উঠতে পারছিল না আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। ভারতীয় হাইকমিশনার সেই অভাবনীয় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর বিশেষ বিমানটি যখন ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং জরুরি অবতরণের অনুমতি চায়, তখন পুরো বিষয়টি ছিল চরম আকস্মিক।

 

ভারতের বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী তাকে বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়নি। বরং বাংলাদেশের নিজস্ব সামরিক বিমানে করেই তিনি দেশত্যাগ করেছিলেন। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, "আমি তখন টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছিলাম।

 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের স্ক্রলে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে লেখা আসছিল যে তিনি অন্য কোথাও, সম্ভবত অন্য কোনো দেশে চলে যাচ্ছেন। পুরো বিষয়টি ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। তাই সেই চরম অনিশ্চয়তার সময়ে, যখন শেখ হাসিনা তখনও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন, তখন তাকে জরুরি ভিত্তিতে অবতরণের সুযোগ ও আশ্রয় দেওয়া ছাড়া আমাদের কাছে কার্যত তেমন কোনো বিকল্প ছিল না।

 

দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে সেই চরম বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া আমাদের জন্য এক প্রকার অপরিহার্য দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।" কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দীনেশ ত্রিবেদী উপস্থিত দর্শকদের সামনে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, অনেক সময় রাষ্ট্রীয় জীবনে এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার জন্য কেউই আগে থেকে মানসিকভাবে বা কৌশলগতভাবে প্রস্তুত থাকে না। সেই দিনটিতেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল।

 

ভারত যদি সেদিন বাংলাদেশের সামরিক বিমানটিকে অবতরণের অনুমতি না দিত, তাহলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত, তা নিয়েও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। তার মতে, "আমাদের কাছে তখন আর কী বিকল্প অবশিষ্ট ছিল?

 

আমরা যদি সেদিন কঠোর অবস্থান নিয়ে বলতাম যে, না, আমরা তাকে কোনোভাবেই গ্রহণ করব না, আমরা আমাদের দেশের মাটিতে বিমানটিকে ল্যান্ডিং বা অবতরণের অনুমতি দেব না, তবে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ বা জটিল আকার ধারণ করত, তা আমার জানা নেই।

 

একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর জীবন যখন বিপন্ন, তখন তাকে ফিরিয়ে দেওয়া কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব নয়। সুতরাং, এটিই হলো সেই ঐতিহাসিক কারণ, যার প্রেক্ষিতে ভারত সেদিন শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিল।"

 

সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বাভাবিকভাবেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যার্পণ বা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে আসে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সাধারণ জনগণের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।

 

এই স্পর্শকাতর প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার অত্যন্ত পেশাদার ও সতর্কতার সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যার্পণ করার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও আইনি প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

 

এটি কোনো একক রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। ভারত সরকার ইতোমধ্যে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্রের মাধ্যমে বারবার এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট করেছে। এর সঙ্গে একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে।

 

এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক প্রত্যার্পণ চুক্তি এবং আইনি বৈধতার নানাবিধ দিক সম্পৃক্ত, যা অত্যন্ত সুগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের অধীন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রত্যার্পণ চুক্তির বাস্তবায়ন একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, যেখানে বিচারবিভাগীয় পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়।

 

দীনেশ ত্রিবেদী আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, এই প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইন দেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তিনি বলেন, "এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে গেলে বলতে হয়, আইনি প্রক্রিয়াটি নিজস্ব গতিতে চলছে এবং এটি সরাসরি আদালতের এখতিয়ারের সঙ্গে জড়িত।

 

বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ায় সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আপনাদের এই বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারবে না যে ঠিক কবে বা কখন এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। বাকি আইনি বিষয়গুলো সম্পর্কে আমারও বিস্তারিত জানা নেই।

 

তবে আইনি প্রক্রিয়া যে চলমান রয়েছে, সে বিষয়ে আপনারা পুরোপুরি নিশ্চিত থাকতে পারেন।" বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন যে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো ঘটেছে, বিশেষ করে সাধারণ ছাত্র-জনতার যে প্রাণহানি হয়েছে, সে বিষয়েও ভারতীয় হাইকমিশনার গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন।

 

তিনি বলেন, সেসময় বাংলাদেশে যে চরম মর্মান্তিক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, মূলত তারই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে এই দেশত্যাগের ঘটনা ঘটেছিল। ভারত সবসময় প্রতিবেশী দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করে।

 

তিনি অত্যন্ত আবেগময় কণ্ঠে বলেন, "আমরা সর্বান্তকরণে আশা করি এবং প্রার্থনা করি যে, এমন মর্মান্তিক ঘটনা যেন আর কখনো, পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই না ঘটে, যেখানে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও সাধারণ মানুষ সহিংসতায় নিহত হয়।"

 

এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর জোর দেন এবং মানবাধিকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তার প্রতিও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত করেন।

 

পরিশেষে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং উভয় দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি গভীর আস্থা জ্ঞাপন করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ যেমন একটি প্রাণবন্ত, সচেতন ও সক্রিয় গণতান্ত্রিক দেশ, ভারতও ঠিক তেমনি একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

 

দুটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই তাদের নিজস্ব সংবিধান, বিচারব্যবস্থা ও আইনি কাঠামোর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক ও নীতিনির্ধারকরা ভারতের স্বাধীন আইনি ব্যবস্থাকে সম্মান করবেন এবং এর নিজস্ব গতিতে চলার সুযোগ দেবেন।

 

স্বাধীন আইনি ব্যবস্থা তার নিজস্ব নিয়ম ও নিরপেক্ষতার সঙ্গেই তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আইনি কাঠামোর প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং পরিপক্ব কূটনৈতিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে আগামী দিনে প্রতিবেশীসুলভ এই সম্পর্ক আরও বাস্তবসম্মত, টেকসই ও পরিণত হবে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।