রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২৬
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাইমা রহমানের জাতিসংঘের চাকরিতে সরকারের সম্পৃক্ততা নেই

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

জাইমা রহমানের জাতিসংঘের চাকরিতে সরকারের সম্পৃক্ততা নেই
ছবি: সংগৃহীত

সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান নানা বিতর্ক ও গুঞ্জনের অবসান ঘটাতে সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জাতিসংঘে নিয়োগপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা বা প্রভাব নেই বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানানো হয়েছে।

 

রবিবার রাজধানী ঢাকার সচিবালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

 

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের এই আন্তর্জাতিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে ও ডিজিটাল মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, সরকার সেটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেছে।

 

মাহদী আমিন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক এই সংস্থায় জাইমা রহমান তার নিজস্ব মেধা, যোগ্যতা এবং পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতেই নিয়োগ লাভ করেছেন। একটি স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হয়েছে-এমন দাবিকে তিনি চরম মিথ্যাচার বলে উড়িয়ে দেন।

 

জাতিসংঘের নিয়োগকাঠামো ও যোগ্যতার মাপকাঠি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা বিভ্রান্তি দূর করতে সংবাদ সম্মেলনে নিয়োগপ্রক্রিয়ার কারিগরি দিকগুলোও বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। উপদেষ্টার দেওয়া তথ্যমতে, ব্যারিস্টার জাইমা রহমান জাতিসংঘের যে পদটির জন্য আবেদন করেছিলেন এবং চূড়ান্তভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, সেটি মূলত পেশাগত স্তর বা পি-৩ পর্যায়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ।

 

জাতিসংঘের বৈশ্বিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নীতি অনুযায়ী, এ ধরনের একটি সম্মানজনক পেশাগত পদে আসীন হওয়ার জন্য প্রার্থীর ন্যূনতম পাঁচ বছরের প্রাসঙ্গিক ও উচ্চমানের পেশাগত অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

 

নিয়োগের স্তরবিন্যাস ব্যাখ্যা করে তিনি জানান যে, জাতিসংঘের কাঠামোতে পি-১ হলো সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা তরুণদের জন্য প্রবেশনারি বা প্রারম্ভিক পর্যায়ের চাকরি। এর পরবর্তী ধাপে পি-২ পদের জন্য প্রার্থীর অন্তত দুই বছরের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকা বাঞ্ছনীয়।

 

এরপর আসে পি-৩ পর্যায়, যেখানে পাঁচ বছরের নিবিড় পেশাগত অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। এর ওপরে পি-৪, পি-৫ সহ আরও উচ্চতর নীতিনির্ধারণী পদ রয়েছে। জাইমা রহমানের দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আইনি পেশায় অভিজ্ঞতার প্রোফাইলটি এই পি-৩ পদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই তাকে নিজস্ব যোগ্যতায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

 

এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রভাব খাটানোর অভিযোগকে পুরোপুরি অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে মাহদী আমিন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কর্মপদ্ধতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতিসংঘের মতো একটি সর্বজনীন ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের একক আধিপত্য বা সুপারিশ কাজ করে না।

 

জাতিসংঘের নিজস্ব অত্যন্ত কঠোর নিয়মকানুন, বিধিমালা এবং সুনির্দিষ্ট কার্যপ্রণালি রয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা দল সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে সারা বিশ্ব থেকে আসা আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ ও পদায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

 

ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের এই চিরাচরিত ও কঠোর প্রক্রিয়াটিই অক্ষরে অক্ষরে অনুসৃত হয়েছে, যেখানে বাইরের কোনো হস্তক্ষেপের ন্যূনতম সুযোগ নেই। এমনকি তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন যে, যেকেউ চাইলে জাতিসংঘের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে এই নিয়োগের সত্যতা এবং এর স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য যাচাই করে দেখতে পারেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয় নয়, বরং সরকারের শীর্ষ পর্যায়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান বহুমুখী অপপ্রচার ও গুজবের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ছবি প্রকাশ হওয়ার পর একটি স্বার্থান্বেষী মহল সেটিকে ভুয়া বা বিকৃত বলে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করে।

 

এই প্রসঙ্গে ডক্টর মাহদী আমিন অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির আঙিনায় একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকারপ্রধানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ এবং তাদের মধ্যকার আন্তরিক আলোচনা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও দেশের জন্য গর্বের বিষয়।

 

এই ছবিটির সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই, কারণ খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন হোয়াইট হাউস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসও তাদের নিজস্ব মাধ্যম থেকে ছবিটি শেয়ার করে এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

 

এরপরও এ নিয়ে মিথ্যাচার করাকে তিনি হীনম্মন্যতা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের লক্ষণ বলে মন্তব্য করেন। যা সম্পূর্ণ সত্য এবং প্রাকৃতিকভাবেই দৃশ্যমান, সে বিষয়ে অহেতুক ধোঁয়াশা সৃষ্টির কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

 

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডাক্তার জুবায়দা রহমানকে জড়িয়ে ছড়ানো একটি ভিত্তিহীন গুজবের বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। কিছুদিন আগে একটি মহলের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি একটি অনুষ্ঠানে একজন বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন।

 

অথচ পরবর্তীতে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজকরা নিজেরাই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন যে, প্রচারিত তথ্যটি সম্পূর্ণ ভুল ও বানোয়াট ছিল। শুধু তা-ই নয়, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নাম ব্যবহার করে সম্প্রতি এক স্বনামধন্য অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতার কাছে চাঁদাবাজির যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল, সেটির পেছনের প্রকৃত সত্যও সংবাদ সম্মেলনে উন্মোচন করা হয়।

 

বিশদ তদন্তের পর প্রশাসন নিশ্চিত হয়েছে যে, ওই ব্যক্তির দখলকৃত স্থানটি অবৈধ হওয়ায় দুটি স্থানীয় পক্ষের মধ্যে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল। এই ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় বা জাতীয় রাজনীতির বিন্দুমাত্র কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

 

তারপরও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেখানে ভাঙচুর চালানো হয় এবং বিএনপির মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নামে চাঁদাবাজির মিথ্যা অপবাদ প্রচার করা হয়। তবে সরকার এই ঘটনায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি।

 

সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে প্রকৃত আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বর্তমানে মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর সুষ্ঠু তদন্ত চলমান রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপত্র বলেন, প্রতিদিন হাজার হাজার ভিত্তিহীন খবর তৈরি হচ্ছে এবং প্রচুর মানুষ সেগুলো দেখছেন ও শেয়ার করছেন; অথচ বাস্তবের সঙ্গে সেগুলোর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।

 

তিনি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুণগত পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন বিশ্বদরবারে গিয়ে জাতিসংঘের মতো সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন তিনি কেবল একটি দলের নন, বরং গোটা দেশের আপামর জনসাধারণের ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করেন।

 

সেখানে তিনি যে সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জন করেন, তা শুধু কোনো নির্দিষ্ট দলের একার অর্জন নয়; এটি সমগ্র বাংলাদেশের সম্মান। বর্তমান সরকার দলমত-নির্বিশেষে সব নাগরিকের সরকার।

 

তাই অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি, অপপ্রচার ও অশালীন আচরণের পথ পরিহার করে একটি সুস্থ, গঠনমূলক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় ফিরে আসার জন্য তিনি সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। একে অপরের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে এবং কেবল ন্যায় ও সত্যকে ধারণ করে একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে একযোগে কাজ করার বার্তা দিয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলনটি সমাপ্ত করেন।