সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬
২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষকেরা আজীবন রাষ্ট্রের কাছে পরম শ্রদ্ধেয় ও সম্মানীয়: প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

শিক্ষকেরা আজীবন রাষ্ট্রের কাছে পরম শ্রদ্ধেয় ও সম্মানীয়: প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় দেশের শিক্ষাগুরুদের প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

 

সোমবার, রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, একজন শিক্ষক তাঁর সক্রিয় কর্মজীবনে থাকুন অথবা কর্মজীবন শেষে অবসর জীবনে প্রবেশ করুন, সুমহান ও পবিত্র পেশার কারণে আমৃত্যু তিনি রাষ্ট্রের কাছে পরম সম্মানীয়।

 

একটি জ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে শিক্ষকদের যে নীরব ও অনস্বীকার্য অবদান রয়েছে, তা কোনো পার্থিব মানদণ্ডে পরিমাপ করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সারগর্ভ বক্তব্যে মানবজীবনের সার্বিক বিকাশে শিক্ষকদের অপরিহার্য ভূমিকার কথা বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, শিশুর জীবনের প্রথম পাঠশালা হলো তার নিজস্ব পরিবার। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পা রাখার পর প্রতিটি শিক্ষার্থীর সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বড় অনুকরণীয় আদর্শ। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের জীবনাদর্শ, কথা ও চালচলন দ্বারা অত্যন্ত গভীরভাবে প্রভাবিত হয়।

 

তাই শিক্ষকরা যেন নিজেদের নিখুঁত আদর্শ হিসেবে প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে পারেন, সরকার সেই লক্ষ্যে নানামুখী যুগোপযোগী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। একটি আত্মপ্রত্যয়ী ও সৎ প্রজন্ম গড়তে হলে সবার আগে শিক্ষকদের আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।

 

বর্তমান বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিগত প্রেক্ষাপটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা এখন মানবসভ্যতার এমন এক অনন্য যুগে বসবাস করছি, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অবারিত বিকাশ ঘটেছে।

 

এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির খোলস থেকে বেরিয়ে এসে কারিগরি ও ব্যাবহারিক শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া এখন বিকল্পহীন হয়ে উঠেছে। কেবল সনাতন পদ্ধতির মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পক্ষে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

 

একুশ শতকের অত্যাধুনিক চাহিদাকে ধারণ করে শিক্ষণ পদ্ধতির কৌশলগত পরিবর্তন এবং পাঠ্যসূচির আধুনিকায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই বাস্তবতায় সরকার অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় সম্পূর্ণ নতুন ও বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করেছে, যা চলতি বছরের মধ্যেই দেশের শিক্ষার্থীরা হাতে পেতে যাচ্ছে।

 

শিক্ষার্থীদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করা এবং পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যেন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের কাছে ভীতিকর মনে না হয়। তারা যেন কোনো ক্রমেই বইবিমুখ হয়ে না ওঠে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।

 

এ ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে আনন্দময় শিখন পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কেবল অন্ধের মতো মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে শিক্ষার্থীদের মনে ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’-এমন যৌক্তিক কৌতূহল জাগিয়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

 

কারণ, নতুন কিছু জানার কৌতূহল থাকলে একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একান্ত উদ্যোগে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে ‘আনন্দময় শিখন’ শিরোনামে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকের বই তুলে দেওয়া হচ্ছে।

 

শিক্ষার্থীরা যেন মানসিক চাপ ছাড়া লেখাপড়া করতে পারে, মূলত সেই উদ্দেশ্যেই এ ধরনের যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণির কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্যও আকর্ষণীয় বইয়ের ব্যবস্থা করা হবে।

 

সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার সামনে থাকা বিপুল সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকের এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের সামনে একদিকে যেমন বিপুল সম্ভাবনার হাতছানি রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে প্রযুক্তিগত বড় চ্যালেঞ্জ।

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ মানুষের জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে অবারিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ধারণাকেও সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এখন আর কেবল সনদনির্ভর জ্ঞান দিয়ে টিকে থাকার সুযোগ নেই; বরং বাস্তবমুখী, কারিগরি ও ব্যাবহারিক জ্ঞান অর্জন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

 

তথ্যপ্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতি শিক্ষকদের সামনেও প্রতিনিয়ত বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তাই সময়ের এই পরিবর্তনশীল চ্যালেঞ্জ সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়গুলোর সার্বিক আধুনিকায়ন ও শিক্ষকদের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

দেশের শিক্ষা খাতের সম্প্রসারণ ও সর্বোচ্চ অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বর্তমান সরকার দেশে এমন এক সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে বদ্ধপরিকর, যেখানে প্রান্তিক পর্যায়ের কোনো শিশুও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে না।

 

কোনো শিক্ষার্থী অভাব বা পারিপার্শ্বিক কারণে মাঝপথে ঝরে পড়লেও তাকে যেন বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সেই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

 

শিক্ষা খাত যে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে, তার প্রমাণ মেলে এবারের জাতীয় অর্থ বরাদ্দের দিকে লক্ষ করলে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আগামীতে আরও বৃদ্ধি করা হবে।

 

মাধ্যমিক শিক্ষার বিশাল পরিধি ও কাঠামোর কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমানে সারা দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় একুশ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন লক্ষাধিক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করে চলেছেন।

 

তবে দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার এই বিশাল অংশটি মূলত বেসরকারি এবং সরকারি অনুদানভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। প্রধানমন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেন যে, কাঠামোগত ও গুণগত দিক থেকে শহর এবং গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছুটা পার্থক্য বিরাজমান রয়েছে।

 

তবে গ্রামাঞ্চল কিংবা শহরাঞ্চল-সব এলাকার শিক্ষার্থীরাই যেন সমানভাবে অত্যন্ত দক্ষ শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করতে পারে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধাগুলো সমানভাবে ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে।

 

এ ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে বর্তমান সরকারের অন্তর্নিহিত দর্শন হলো-সকলের জন্য সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও নৈতিকতার অপূর্ব মেলবন্ধনের বিষয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দার্শনিক বক্তব্য প্রদান করেন তিনি।

 

তিনি বলেন, জীবনমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাপক প্রয়োজন থাকলেও আমাদেরকে এটি সর্বদা অনুধাবন করতে হবে যে, কেবল একটি ভালো চাকরি পাওয়াই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার সর্বোৎকৃষ্ট ও মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যকার নৈতিকতার পূর্ণ বিকাশ এবং একটি উন্নত ও আদর্শ চরিত্র গঠন।

 

কোনো অর্জিত জ্ঞান যদি নৈতিকতার সুতোর সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে সেই মেধা সমাজের মঙ্গলের পরিবর্তে চরম অমঙ্গল ও ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং, সত্যবাদিতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, গভীর দেশপ্রেম, মানবিকতা, ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা এবং অন্যের মতামতের প্রতি বিনম্র সম্মান প্রদর্শন-এই শাশ্বত মূল্যবোধগুলোকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে।

 

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে নিজ পরিবারের ঠিক পরেই শিক্ষক-শিক্ষিকারাই সমাজের সবচেয়ে বড় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। পরিশেষে, শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা, জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়ে বর্তমান সরকারের অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থানের কথা ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সামগ্রিক শিক্ষক সমাজ, বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা বিধানে সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।

 

শিক্ষকতা পেশাকে অন্যান্য পেশার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্মানের দিক থেকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই সরকার বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, শিক্ষকতা পেশা কখনোই জীবনযুদ্ধে ব্যর্থ হওয়ার পর উপায়হীন বিকল্প বা কেবল একটি গতানুগতিক চাকরির মতো হতে পারে না। বরং মেধা ও মননে যিনি সমাজের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সেই মেধাবী মানুষটিই যেন কর্মজীবনে শিক্ষকতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে স্বেচ্ছায় বেছে নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে ঠিক সেভাবেই ঢেলে সাজাচ্ছে।

 

কারণ, সমাজে শিক্ষকদের যে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয়, তার সঙ্গে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি সরাসরি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকলে সারা বিশ্বের দরবারে সেই রাষ্ট্রের সম্মান বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।