এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় বাজেটে বা জাতীয় অর্থ বরাদ্দে শিক্ষা খাতে এ বছর সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার, ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে তিনি এই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘোষণা প্রদান করেন।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং একটি বৈষম্যহীন মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের যে সুস্পষ্ট রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন, তা ইতিমধ্যেই দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মাঝে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে যে পরিমাণ নজর দেওয়া হয়, মানবসম্পদ বা শিক্ষা খাতে সে অনুপাতে বরাদ্দ অনেক সময়ই অপ্রতুল থাকে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের এই যুগান্তকারী ঘোষণা সেই প্রথাগত ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুধু একটি সাধারণ আর্থিক পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের গভীর দায়বদ্ধতার এক অকাট্য প্রমাণ। তিনি তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার সার্বিক প্রসার ও গুণগত মান উন্নয়নের জন্য অর্থের কোনো ঘাটতি রাষ্ট্র আর রাখবে না।
আগামী পাঁচ বছরের জন্য সরকারের এক সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, শিক্ষা খাতে এই রাষ্ট্রীয় বরাদ্দের পরিমাণ ধাপে ধাপে আরও যৌক্তিক হারে বৃদ্ধি করা হবে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি প্রান্তে, তা সে যত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল বা চরাঞ্চলই হোক না কেন, প্রতিটি নাগরিকের কাছে শিক্ষার সমান সুযোগ পৌঁছে দেওয়া।
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সরকার এমন এক সর্বজনীন, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর, যেখানে নিছক আর্থিক দৈন্য বা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশের একটি শিশুও শিক্ষার আলো থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবে না।
প্রথাগত, সনাতন ও গণ্ডিবদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার খোলস থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম বা পাঠ্যক্রম প্রণয়নের ওপর সরকার যে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে, তা প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে উঠে এসেছে।
তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, সম্পূর্ণ নতুন, গবেষণালব্ধ ও বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ্যক্রম অনুযায়ী দেশের শিক্ষার্থীরা এই বছর থেকেই তাদের নতুন পাঠ্যপুস্তক হাতে পেতে শুরু করবে। শিক্ষাকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয়, ভয়হীন ও উপভোগ্য করে তোলার জন্য 'আনন্দময় শিক্ষা' বা শিখন কৌশলের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন সরকারপ্রধান।
দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা কেবল মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা এবং পরীক্ষার অতিরিক্ত চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় নিজেদের পাঠ্যবইয়ের প্রতি চরম অনীহা বা ভীতি প্রদর্শন করে থাকে, যা তাদের মানসিক বিকাশের পথে একটি বড় অন্তরায়।
এই ভীতিকর ও একঘেয়ে পরিস্থিতি থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে এনে পড়াশোনাকে তাদের কাছে একটি আনন্দদায়ক, কৌতূহলোদ্দীপক ও সৃজনশীল অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য শিক্ষাদানের প্রচলিত কৌশলে ব্যাপক ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নতুন এই শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং তাদের অন্তর্নিহিত সৃজনশীলতার পূর্ণ বিকাশে ব্যাপকভাবে সহায়তা করবে বলে শিক্ষাবিদেরা মনে করছেন। একুশ শতকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং নবপ্রযুক্তির এই যুগে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে কেবল পুঁথিগত বা তাত্ত্বিক জ্ঞানই কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
এর পাশাপাশি আধুনিক কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপরও সমান দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত অভাবনীয় উৎকর্ষের কারণে শিক্ষাদানের পদ্ধতি ও মনস্তত্ত্বে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শাশ্বত দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, প্রযুক্তি যতই উন্নত, আধুনিক বা স্বয়ংক্রিয় হোক না কেন, তা কখনোই রক্তমাংসের একজন মানব শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে তিনি শিক্ষকের একজন অত্যন্ত শক্তিশালী, কার্যকর ও সহায়ক মাধ্যম হিসেবেই দেখতে চান। শিক্ষকরা তাদের অগাধ স্নেহ, মমতা, নৈতিক শিক্ষা ও সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে শিক্ষার্থীদের যে মানবিক ও মানসিক বিকাশ ঘটান, পৃথিবীর কোনো কৃত্রিম মেধা বা যন্ত্রের পক্ষে তা প্রদান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
তবে সময়ের সঙ্গে যথাযথভাবে তাল মেলাতে এবং শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানের সমকক্ষ করতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যম বা মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষের ব্যাপক সম্প্রসারণের এক বিশাল উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ, সমৃদ্ধ ও উন্মুক্ত দুনিয়ায় যুক্ত করার লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনামূল্যে তারবিহীন ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের যুগান্তকারী কার্যক্রমও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দেশব্যাপী এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই যুগান্তকারী ও কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে শিক্ষকদেরও যথাযথভাবে প্রস্তুত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে সরকার। সময়ের এই আধুনিক, প্রযুক্তিগত ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য যারা সামনের সারির কারিগর হিসেবে কাজ করবেন, সেই শিক্ষকদের নিজস্ব পেশাগত দক্ষতা ও মানসিক উৎকর্ষ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে গভীরভাবে অনুধাবন করে দেশের সকল স্তরের শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়গুলোকে সম্পূর্ণ আধুনিকায়নের একটি বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বিস্তারিত জানান।
শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিশু মনস্তত্ত্ব, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার সম্পর্কে নিয়মিত, ধারাবাহিক ও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে করে তারা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের আরও বেশি দক্ষ, যুগোপযোগী ও আত্মবিশ্বাসী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।
সমাজের অন্যান্য সকল সাধারণ পেশার ঊর্ধ্বে শিক্ষকতা পেশার সামাজিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান সমুন্নত রাখার বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়, অনড় ও আপসহীন অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন যে, শিক্ষকতা পেশা কখনোই জীবনযুদ্ধে বা কর্মসংস্থানের দৌড়ে ব্যর্থ হওয়ার পর কোনো নিরুপায় বা উপায়হীন বিকল্প পেশা হতে পারে না।
এটি একটি অত্যন্ত মহান, পবিত্র ও সমাজ গড়ার কারিগরের মর্যাদাপূর্ণ ব্রত। দেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল, সৃজনশীল ও মেধাবী তরুণেরা যেন স্বপ্রণোদিত হয়ে শিক্ষকতা পেশাকে তাদের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের প্রথম ও প্রধান পছন্দের তালিকায় রাখেন, সেই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বর্তমান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে, মেধাভিত্তিকভাবে ও চরম স্বচ্ছতার সঙ্গে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
মেধাবীদের এই মহান পেশায় ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করতে হলে তাদের সামাজিক মর্যাদার পাশাপাশি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। বর্তমান সরকার দেশের সকল স্তরের শিক্ষকদের নিরঙ্কুশ আর্থিক নিরাপত্তা, সম্মানজনক বেতন কাঠামো এবং সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নের জন্য ইতিমধ্যে নানামুখী কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সরকারের উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষকরা যেন নিজেদের পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কোনো ধরনের মানসিক ও আর্থিক দুশ্চিন্তা ছাড়াই সম্পূর্ণ একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও প্রশান্তির সঙ্গে পাঠদান কার্যক্রমে নিজেদের আত্মনিয়োগ করতে পারেন।
পরিশেষে সার্বিক পর্যালোচনায় এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এই পবিত্র লগ্নে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সুচিন্তিত ও দূরদর্শী বক্তব্য দেশের সামগ্রিক শিক্ষা খাতের জন্য এক বিশাল আশার আলো এবং নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।
শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দ প্রদান, যুগোপযোগী ও আনন্দময় আধুনিক পাঠ্যক্রমের প্রবর্তন, প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির অবাধ সম্প্রসারণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর বিশ্বমানের আধুনিকায়ন এবং সর্বোপরি জাতির কারিগর হিসেবে শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধির যে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তা যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই একটি শতভাগ শিক্ষিত, দক্ষ, মানবিক ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষা, আর সেই মেরুদণ্ডকে সোজা, সুদৃঢ় ও অটুট করার জন্য বর্তমান সরকার যে সুদূরপ্রসারী ও সাহসিকতাপূর্ণ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে, তা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অপার সম্ভাবনার বিশাল দ্বার উন্মুক্ত করে দেবে বলে দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।