মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২৬
২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি, ২২ অক্টোবর নতুন ছুটি অনুমোদন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি, ২২ অক্টোবর নতুন ছুটি অনুমোদন
ছবি: সংগৃহীত

শারদীয় দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে সারা দেশে এক উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষ এই উৎসবের আনন্দের অংশীদার হন।

 

এ বছর পূজার সার্বজনীন আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিতে এবং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অবকাশ যাপনের এক চমৎকার সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার একটি যুগান্তকারী ও অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে আগামী ২২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, এক দিনের বিশেষ সাধারণ ছুটি অনুমোদনের প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে পাস করেছে মন্ত্রিসভা। এর ফলে দুর্গাপূজার পূর্বনির্ধারিত সরকারি ছুটি এবং নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে এবার টানা পাঁচ দিনের এক দীর্ঘ অবকাশ যাপনের বিরল সুযোগ পাচ্ছেন দেশের চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ।

 

সোমবার, ৫ অক্টোবর, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী বৈঠকে এই বিশেষ ছুটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

 

সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্র এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা যেন সকলে অত্যন্ত নির্বিঘ্নে, শান্তিপূর্ণভাবে এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দের মাধ্যমে উদ্‌যাপন করতে পারেন, সেই মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই সরকার এই সংবেদনশীল সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছে।

 

এই সিদ্ধান্তের ফলে সারা দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ও ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি ছুটির পূর্বনির্ধারিত বাৎসরিক তালিকা অনুযায়ী, দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে চলতি বছরে ২০ ও ২১ অক্টোবর সরকারি ছুটি হিসেবে নির্ধারিত ছিল।

 

ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী, এর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ২২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, সমস্ত সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত কার্যালয় খোলা থাকার কথা ছিল। কিন্তু ২২ অক্টোবরের পরদিন ২৩ ও ২৪ অক্টোবর যথাক্রমে শুক্রবার ও শনিবার হওয়ায় তা নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির অন্তর্ভুক্ত।

 

ফলে মাঝখানে কেবল এক দিনের জন্য কার্যালয় খোলা রাখা হলে সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের জন্য বাড়ি ফেরা বা দীর্ঘ ছুটি উপভোগ করার ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত জটিলতা তৈরি হতো।

 

এক দিনের জন্য দূরদূরান্ত থেকে কর্মস্থলে ফেরা অনেকের জন্যই অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ভোগান্তির বিষয় হয়ে দাঁড়াত। এই সার্বিক বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করে এবং উৎসবের আমেজকে নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে মন্ত্রিসভা অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে মাঝখানের কর্মদিবস ২২ অক্টোবরকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছে।

 

এই যুগান্তকারী ও জনবান্ধব সিদ্ধান্তের ফলে আগামী ২০ অক্টোবর থেকে শুরু করে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন সরকারি ছুটি উপভোগ করবেন দেশের বৃহৎ এক কর্মজীবী গোষ্ঠী। কর্মব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটাতে এমন দীর্ঘ ছুটি নিঃসন্দেহে চাকরিজীবীদের জন্য এক পরম পাওয়া।

 

বিশেষ করে যারা কর্মস্থলের কারণে নিজেদের শেকড় অথবা পরিবার থেকে দূরে অবস্থান করেন, তারা এই দীর্ঘ ছুটিকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই নিজেদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারবেন। এতে করে পারিবারিক বন্ধন যেমন সুদৃঢ় হবে, তেমনি সামাজিক সম্প্রীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনও তৈরি হবে সমগ্র দেশজুড়ে।

 

চলতি বছরের শারদীয় দুর্গাপূজার বিস্তারিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার দিন দেবী দুর্গা মর্ত্যলোকে আগমনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং এই দিনটিতে দেশজুড়ে বিশেষ পূজার্চনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

এরপর ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে মহাষষ্ঠী, যার মাধ্যমে মণ্ডপে মণ্ডপে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ধারাবাহিকভাবে ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী বা প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই সার্বজনীন উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

 

বিজয়া দশমীর দিনটি সরকারি ছুটি হিসেবে পরিগণিত হয় এবং সারা দেশে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে দিনটি পালিত হয়। বাংলাদেশ আবহমান কাল ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত। এখানে ধর্ম যার যার হলেও উৎসব সবার।

 

দুর্গাপূজার এই দিনগুলোতে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের মানুষেরাও আনন্দে মেতে ওঠেন। হাজার হাজার পূজামণ্ডপ সেজে ওঠে রঙিন আলো ও মনোরম সাজসজ্জায়। সরকারের এই দীর্ঘ ছুটির ঘোষণা সেই সর্বজনীন উৎসবের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

তবে এই বিশাল আনন্দ আয়োজনের পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় রয়েছে। সারা দেশে হাজার হাজার পূজামণ্ডপের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং উৎসবকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

 

টানা পাঁচ দিনের এই দীর্ঘ ছুটির কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতেও এর এক ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। টানা ছুটির কারণে বহু মানুষ রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহর ছেড়ে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে অথবা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যাওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করবেন।

 

এর ফলে পরিবহন খাত, বিশেষ করে সড়কপথ, রেলপথ এবং নৌপথে যাত্রীদের এক বিশাল চাপ তৈরি হবে। এই অতিরিক্ত যাত্রাপের বিষয়টি মাথায় রেখে এখন থেকেই পরিবহন কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মহাসড়কের যানজট নিরসন করা এবং নির্বিঘ্ন যাতায়াতের পরিবেশ তৈরি করা সরকারের জন্য একটি বড় প্রশাসনিক পরীক্ষা হবে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের ঢল নামার সম্ভাবনায় হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে, যা দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।

 

অন্যদিকে, মন্ত্রিসভার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নির্দেশনার কথাও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশবাসীকে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।

 

বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে আগামী ২২ অক্টোবর সাধারণ ছুটি ঘোষণার কারণে যে কর্মদিবসটি নষ্ট হচ্ছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আগামী ১৭ অক্টোবর, শনিবার, দেশের সকল সরকারি অফিস, আদালত এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যালয় সম্পূর্ণ খোলা থাকবে।

 

ওই দিন নিয়মিত স্বাভাবিক কর্মদিবসের মতোই সেখানে যাবতীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার অফিস খোলা রাখার এই সিদ্ধান্তটি মূলত রাষ্ট্রীয় কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং নাগরিক সেবা যাতে কোনোভাবেই দীর্ঘ সময়ের জন্য বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই গ্রহণ করা হয়েছে।

 

এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, সরকার একদিকে যেমন নাগরিকদের ধর্মীয় উৎসব ও ছুটির আনন্দকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে, ঠিক অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের স্বাভাবিক গতিশীলতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও সমানভাবে সচেতন ও দায়িত্বশীল।

 

পরিশেষে বলা যায়, একটি আধুনিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো এর নাগরিকদের মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে টানা পাঁচ দিনের এই দীর্ঘ ছুটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকার সেই সামাজিক সম্প্রীতি ও নাগরিকদের মানসিক প্রশান্তির প্রতি এক অনন্য ও অনুকরণীয় সম্মান প্রদর্শন করেছে।

 

দীর্ঘ এই ছুটি দেশের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে কর্মক্ষেত্রে তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে এই ছুটির আনন্দ যেন কোনোভাবেই যানজটের কারণে জনদুর্ভোগ বা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ নাগরিক-উভয়কেই সর্বোচ্চ সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। একটি সুস্থ, সুন্দর, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশেই কেবল এমন দীর্ঘ অবকাশ যাপনের প্রকৃত সুফল লাভ করা সম্ভব।