মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২৬
২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবিক ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিশুদের অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:০৫ পিএম

মানবিক ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিশুদের অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

একটি টেকসই, উন্নত এবং মানবিক রাষ্ট্র গঠনের প্রধান পূর্বশর্ত হলো সেই রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সহানুভূতিশীল, দায়িত্বশীল এবং পরিবেশসচেতন হওয়া। আর এই মানবিক গুণাবলি ও নৈতিক মূল্যবোধ অর্জনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সময় হলো মানুষের শৈশবকাল।

 

একটি আধুনিক, অগ্রসর এবং ভবিষ্যৎমুখী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এবার দেশের শিশুদের প্রতি এক ভিন্নধর্মী, সুগভীর ও যুগান্তকারী বার্তা দিয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

 

তিনি কেবল মানুষের প্রতি মানুষের দয়া প্রদর্শনের প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে, চারপাশের প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রাণিকুলের প্রতিও সমানভাবে সহানুভূতিশীল হওয়ার এক উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

 

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বৈশ্বিক পরিবেশবাদীদের কাছেও একটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশের সরকারপ্রধান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশ রক্ষায় সরাসরি উদ্বুদ্ধ করছেন।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই ‘মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্নের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, একটি দেশ কেবল ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে না, বরং এর জন্য প্রয়োজন দেশের নাগরিকদের উন্নত মনন এবং নৈতিক মূল্যবোধের পরিপূর্ণ বিকাশ।

 

তিনি শিশুদের সহজ-সরল ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, দয়া বা অনুকম্পা কেবল মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতিটি উপাদানের প্রতি সদয় আচরণ করা মানুষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

 

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, আজকের শিশুরা যদি শৈশব থেকেই প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে, তবে আগামী দিনে তারাই একটি সত্যিকার অর্থে মানবিক, সভ্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত শত শত শিশু-কিশোরকে সরাসরি সম্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ ভাষায় তাদের প্রাত্যহিক জীবনের কিছু সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, শিশুরা যখন ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে, তাদের চারপাশের প্রকৃতিও ঠিক একইভাবে তাদের সঙ্গে সঙ্গেই বেড়ে উঠছে।

 

বাড়ির আঙিনায়, স্কুলের মাঠে অথবা নিজেদের পছন্দের যেকোনো জায়গায় বেড়ে ওঠা গাছপালার প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল হওয়ার জন্য তিনি শিশুদের প্রতি আহ্বান জানান। একটি ছোট চারাগাছকে নিয়মিত পানি দেওয়া এবং তার নিবিড় পরিচর্যা করার মাধ্যমে শিশুরা কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারে, সেই বিষয়টি তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেন।

 

একইসঙ্গে তিনি চারপাশে থাকা পশুপাখির প্রতিও সহানুভূতিশীল হওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, অবলা এই পশুপাখিগুলোও রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

তাই এদের প্রতি সদয় হওয়া, এদের কিছুটা সময় দেওয়া এবং যেকোনো প্রয়োজনে এদের সহযোগিতা করা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। শিশুদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অভিভাবক এবং শিক্ষকদের প্রতিও এক বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।

 

শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে পরিবারের অপরিসীম ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশুদের মনে প্রকৃতি ও প্রাণিকুলের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি জাগিয়ে তোলার প্রাথমিক দায়িত্ব অভিভাবকদেরই গ্রহণ করতে হবে।

 

শিশুদের ভেতরে যদি ছোটবেলা থেকেই এই বোধটুকু জাগ্রত করা যায় যে, প্রকৃতির প্রতি সদয় হলেই কেবল প্রকৃতি আমাদের প্রতি সদয় হবে, তবে তারা ভবিষ্যৎ জীবনে অত্যন্ত দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। মানুষের বেঁচে থাকা যে সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, সেই অমোঘ সত্যটি শিশুদের গভীরভাবে উপলব্ধি করানোর ওপর তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেন।

 

প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথে হস্তক্ষেপ না করে, বরং তাকে তার নিজস্ব ছন্দে চলতে দিয়ে কীভাবে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারি, সেটিই ছিল তাঁর এই দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের অন্যতম মূল প্রতিপাদ্য।

 

পরিবেশ দূষণ রোধ এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী এক অনন্য ও সময়োপযোগী পথের নির্দেশনা দিয়েছেন। সমাজকাঠামোতে সাধারণত বয়োজ্যেষ্ঠরা শিশুদের শিক্ষা দিয়ে থাকেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক্ষেত্রে শিশুদেরকেই সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের দূত হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা বা ব্যবহার্য বস্তুর মোড়ক ফেলার যে নেতিবাচক প্রবণতা আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মাঝে প্রচলিত রয়েছে, তা দূর করতে তিনি শিশুদের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন।

 

তিনি শিশুদের উদ্দেশ্যে বলেন, যদি তারা দেখে যে কোনো বয়স্ক মানুষ অসচেতনভাবে যত্রতত্র ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছেন, তবে ছোট হিসেবে শিশুরাই যেন অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে অথচ দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের ভুল ধরিয়ে দেয়।

 

শিশুরা যেন সেই ব্যক্তিকে সচেতন করে বলে যে, পরিবেশ নষ্ট হলে বা দূষিত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আজকের শিশুরা এবং আগামী প্রজন্ম। শিশুদের এই নিষ্পাপ অথচ যৌক্তিক প্রতিবাদ বড়দের মনে লজ্জাবোধ জাগ্রত করবে এবং সমাজে একটি স্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে প্রধানমন্ত্রী গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

বাংলাদেশের লক্ষ কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পরিবেশ রক্ষার এই আন্দোলন যে কতটা জরুরি, তা তাঁর কথায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রূপকের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিশুদের অপরিসীম গুরুত্ব তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, একটি ঘর যেমন তার খুঁটিগুলোর ওপর ভর করে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনি প্রতিটি শিশু হলো তাদের পরিবার এবং সমগ্র রাষ্ট্রের এক একটি মজবুত খুঁটি। এই খুঁটিগুলো যদি শৈশব থেকে সঠিক শিক্ষা, নৈতিকতা এবং মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে সুদৃঢ়ভাবে গড়ে ওঠে, তবে সেই পরিবারের ভিত্তি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি সমগ্র রাষ্ট্রও একটি মজবুত কাঠামোর ওপর বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে।

 

একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, সামগ্রিকভাবে দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য যদি একটি সুস্থ, সুন্দর এবং সঠিক বিকাশের অবারিত সুযোগ নিশ্চিত করা যায়, তবে আগামী দিনে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

 

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এই আনন্দঘন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী এবং বিশিষ্ট চিকিৎসাবিদ ডা. জুবাইদা রহমান। এছাড়া সরকারের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সেলিমা রহমানসহ আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

 

তাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি আরও বেশি উৎসবমুখর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। সর্বমহলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এই আলোচনা সভাটি কেবল একটি প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক আয়োজন ছিল না, বরং এটি ছিল আগামীর মানবিক, সহনশীল ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ বিনির্মাণের এক ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ।