মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২৬
২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সরকার: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সরকার: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
ছবি: Collected

দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এবং বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিক এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করছে। মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এ কথা সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

 

দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদের কোটি কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও কৃষির প্রধান অবলম্বন তিস্তা নদীর সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে এই মহাপরিকল্পনাকে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে রেখে এই বৃহৎ ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রকল্পটি কীভাবে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে সরকার বিস্তারিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

তিস্তা নদী বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশের মধ্যকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী, যার পানিবণ্টন ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিগত কয়েক দশক ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা মাত্রিক আলোচনা, চুক্তি ও পর্যালোচনা চলছে।

 

উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি, অর্থনীতি এবং পরিবেশের ভারসাম্য অনেকটাই নির্ভর করে এই তিস্তার পানির ওপর। শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র হাহাকার এবং বর্ষা মৌসুমে বিধ্বংসী বন্যা ও ভয়াবহ নদীভাঙন-এই দুই চরম বৈপরীত্যের শিকার হয়ে প্রতি বছর নিঃস্ব হচ্ছে নদীর দুকূলের হাজার হাজার পরিবার।

 

এই জাতীয় সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়ে সরকারের বর্তমান অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, এই বৃহৎ পরিকল্পনাটি গ্রহণের বিষয়ে সরকার অত্যন্ত ইতিবাচক।

 

তিনি সাংবাদিকদের সামনে স্পষ্ট করে বলেন, যেকোনো বৃহৎ উদ্যোগ হাতে নেওয়ার আগে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাষ্ট্রের সদিচ্ছা। বর্তমান সরকারের সেই সদিচ্ছা শতভাগ রয়েছে এবং তারা এটি বাস্তবে রূপদান করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

 

প্রাথমিক পরিকল্পনার সঙ্গে বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গির বেশ কিছু গুণগত, কারিগরি ও কৌশলগত পরিবর্তনের কথা সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। পূর্ববর্তী সরকারের অর্থাৎ শেখ হাসিনার শাসনামলে নেওয়া প্রাথমিক পরিকল্পনাটি মূলত নদীশাসন এবং ভাঙন রোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

 

সেই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল কেবল বর্ষাকালে তিস্তার ভয়াল রূপ থেকে তীরবর্তী জনপদকে রক্ষা করা। বর্ষাকালে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও নদীভাঙনের কারণে তিস্তা নদী কোথাও কোথাও পাঁচ থেকে আট কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত রূপ ধারণ করে, যা আশপাশের বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবসতি গর্ভে বিলীন করে দেয়।

 

পূর্ববর্তী প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিল, ব্যাপক খননকাজ পরিচালনা করে এবং নদীর দুই পাড়কে স্থায়ী ও শক্তভাবে বাঁধাই করে এই বিশাল বিস্তৃতিকে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে নামিয়ে আনা হবে।

 

এর ফলে নদীভাঙন যেমন রোধ করা সম্ভব হবে, তেমনি নদীর গর্ভে হারিয়ে যাওয়া হাজার হাজার হেক্টর ভূমি পুনরুদ্ধার করাও সম্ভব হবে। পুনরুদ্ধার করা এই বিপুল পরিমাণ ভূমি পরবর্তীতে কৃষি, শিল্প, বনায়ন বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হতো।

 

তবে বর্তমান সরকার এই মহাপরিকল্পনায় একটি যুগান্তকারী, সময়োপযোগী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিক যুক্ত করতে যাচ্ছে। ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, শুধু নদীশাসন বা ভূমি পুনরুদ্ধারই নয়, বরং বর্ষা মৌসুমে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ জলরাশিকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, এখন তার কারিগরি সম্ভাব্যতা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।

 

এ প্রসঙ্গে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি উচ্চ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। ওই বিশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত থেকে তিস্তা নদীর পানিব্যবস্থাপনা নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।

 

সেখানে প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, কেবল নদীশাসন এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়; বর্ষার অতিরিক্ত পানি বৈজ্ঞানিক উপায়ে ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ, সেচ এবং মানুষের জীবনধারণের জন্য তা ব্যবহারের উপযোগী করার ওপর এখন সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।

 

পানির এই সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার কারিগরি দিক ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উপদেষ্টা বলেন, পদ্মা ব্যারাজের যে মূল দৃষ্টিভঙ্গি, সেখানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রেখে অতিরিক্ত পানি একটি নির্দিষ্ট সুবিশাল আধারে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়।

 

তিস্তার ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে বর্ষার উদ্বৃত্ত পানি জমিয়ে রাখার আধুনিক পদ্ধতি উদ্ভাবনের নিরলস চেষ্টা চলছে। উদ্দেশ্য হলো, শুষ্ক মৌসুমে যখন নদীতে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে চারদিক পানিশূন্য প্রান্তরে পরিণত হয়, তখন সেই সংরক্ষিত পানি সেচসহ নানা অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।

 

তবে তিস্তা নদীর স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এই কাজটিকে বেশ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। কারণ, তিস্তা একটি অত্যন্ত খরস্রোতা নদী এবং এর ঢাল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার কারণে উজানের পাহাড়ি ঢলের পানি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিচের দিকে নেমে আসে।

 

প্রবল বেগে নেমে আসা এই পানি ধারণ করে রাখার জন্য এটি একটি বড় প্রাকৃতিক বাধা। তা সত্ত্বেও দেশি-বিদেশি পানিসম্পদ ও নদী বিশেষজ্ঞরা একযোগে কাজ করে যাচ্ছেন এবং তারা সরকারকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন যে, আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যার সাহায্যে একটি কার্যকর ও টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা একেবারেই সম্ভব।

 

তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো একটি বিশাল ও ব্যয়বহুল বৃহৎ প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়টিও মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে এক ধরনের কৌশলগত আগ্রহ রয়েছে।

 

এই স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জানান, প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন কোথা থেকে বা কোন উৎস থেকে হবে, সে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।

 

এটি চীন, বাংলাদেশ নিজস্ব তহবিল নাকি অন্য কোনো বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে হবে-তা সময়মতো যাচাই-বাছাই করে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অর্থায়নের বিষয়টি এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের ওপর অহেতুক নির্ভরতা বা বাধ্যবাধকতা এই সরকারের নেই।

 

অর্থায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে অত্যন্ত সাবলীল অথচ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আমি এইটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি, বাংলাদেশ এমন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, যা সবসময় তার নিজের এবং দেশের আপামর জনগণের স্বার্থের পক্ষে যায়-এমন সিদ্ধান্তই গ্রহণ করবে।’

 

কোনো বিদেশি উৎস থেকে ঋণ বা আর্থিক সহায়তা নিলে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে তা কতটা লাভজনক হবে, নাকি বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করলে দেশের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশি সুরক্ষিত থাকবে-তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

 

তিনি আরও যুক্ত করেন যে, বর্তমান সরকার একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, সার্বভৌম এবং জনকল্যাণমুখী সরকার। এই সরকার তার যেকোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তে জনগণের সার্বিক কল্যাণ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও দেশের মর্যাদাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।

 

পরিশেষে বলা যায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কেবল উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমানই উন্নয়ন করবে না, বরং সমগ্র বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় একটি অভাবনীয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

 

দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, খরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের নির্মম শিকার তিস্তাপাড়ের কোটি মানুষের জন্য বর্তমান সরকারের এই ইতিবাচক ও সুচিন্তিত পদক্ষেপ এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। যদি পানি সংরক্ষণ ও নদীশাসনের এই দ্বিমুখী বৈজ্ঞানিক কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বা রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুব দ্রুতই এই মহাপরিকল্পনার একটি চূড়ান্ত ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হবে বলে সুশীল সমাজ ও বিশ্লেষকরা গভীর আশা প্রকাশ করছেন। একটি স্বনির্ভর, উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র গঠনের পথে তিস্তা মহাপরিকল্পনা হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম একটি সফল এবং ঐতিহাসিক অধ্যায়।