বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একনেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম

একনেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

দেশের সার্বিক উন্নয়নের রূপরেখাকে একটি নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বুধবার অনুষ্ঠিত একনেকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী সভায় মোট ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের ১৩টি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে।

 

এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ ও নগর অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতের বিস্তার এবং নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বহুমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্পগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। অনুমোদিত এই বিশাল বাজেটের অর্থায়নের রূপরেখা অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে দেশীয় তহবিলের পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিজস্ব অংশগ্রহণের একটি চমৎকার ভারসাম্য রাখা হয়েছে।

 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব কোষাগার বা সরকারি খাত থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকার জোগান দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে প্রাপ্ত ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এই উন্নয়ন বাজেটে যুক্ত হবে।

 

এছাড়া, প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো তাদের নিজেদের সংরক্ষিত তহবিল থেকে ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় করবে। অনুমোদিত এই ১৩টি প্রকল্পের রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মধ্যে ১০টি প্রকল্প একেবারেই নতুনভাবে গ্রহণ করা হয়েছে, যা বর্তমান সময়ের আর্থসামাজিক চাহিদার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

অন্যদিকে, চলমান কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে দুটি সংশোধিত প্রকল্প এবং একটির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবকে এই সভায় চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বুধবার দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে আয়োজিত একনেকের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সভায় সভাপতিত্ব করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।

 

তাঁর সুদৃঢ় নেতৃত্ব ও দূরদর্শী নির্দেশনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে বিষদ আলোচনা করা হয়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই নীতিনির্ধারণী বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ সদস্যরা সশরীরে উপস্থিত থেকে প্রকল্পগুলোর যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নিজেদের সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন।

 

জাতীয় স্বার্থে সর্বসম্মতভাবে এই বৃহৎ বাজেট অনুমোদনের মাধ্যমে সরকার প্রমাণ করেছে যে, দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

 

তাদের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জনাব আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন এবং ভূমি মন্ত্রী জনাব মো. মিজানুর রহমান মিনু প্রকল্পগুলোর আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেন।

 

এছাড়াও শিল্প, বস্ত্র ও বাণিজ্য মন্ত্রী জনাব খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানি সম্পদ মন্ত্রী জনাব মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, স্বাস্থ্য মন্ত্রী জনাব সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী জনাব শেখ রবিউল আলম নিজেদের মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন।

 

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জনাব হুমায়ুন কবিরসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এই নীতি-নির্ধারণী পর্যালোচনায় গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।

 

আজকের এই একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া ১৩টি প্রকল্পের খাতভিত্তিক বিন্যাস লক্ষ করলে দেখা যায়, একক মন্ত্রণালয় হিসেবে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ ও অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়।

 

দেশের প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে নগর জীবনের মানোন্নয়নে এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে মোট ৭টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকার ক্রমবর্ধমান নাগরিক চাহিদার কথা বিবেচনা করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বা ডিএসসিসি এর অন্তর্ভুক্ত নতুন ৫টি অঞ্চলের মোট ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সর্বাত্মক উন্নয়নের জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

 

এর ফলে রাজধানীর একটি বিশাল অংশের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন ও যানজট কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তনে রংপুর সিটি করপোরেশনের বা রসিকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং এর ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলোর দ্রুত পুনর্বাসন প্রকল্প অনুমোদন লাভ করেছে।

 

শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বা গাসিক এর ১ থেকে ৮ নম্বর জোনের রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ওই এলাকার শিল্প সংশ্লিষ্ট পরিবহন ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতকে আরও সহজ করবে।

 

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে নারী স্বাবলম্বিতা অর্জন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন উদ্যোক্তা সৃজন প্রকল্পটি বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে।

 

এটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সরাসরি উৎপাদনমুখী অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করবে। অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের সঙ্গে মূল শহরের সংযোগ বাড়াতে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় ও দ্বিতীয় সংশোধনীর প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করা হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে।

 

দেশের পরিবহন ও সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার গতি বাড়াতে এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করতে এই বৈঠকে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। নৌপথের পরিবহন সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন বা বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি নতুন বাণিজ্যিক জলযান এবং ৮টি আধুনিক সহায়ক জলযান সংগ্রহের পাশাপাশি ২টি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ সম্পর্কিত ৩য় সংশোধিত প্রস্তাবটি একনেকে পাস করা হয়েছে।

 

এর ফলে দেশের নদীপথে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে। অন্যদিকে, রেলপথকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ৩০টি নতুন মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা ট্রেনের সময়সূচি বিপর্যয় রোধ ও পণ্য পরিবহন ক্ষমতা বাড়াবে।

 

সড়ক যোগাযোগ খাতেও নেওয়া হয়েছে অভূতপূর্ব উদ্যোগ। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে ভজনপুর-আটোরখাড়ি-ময়নাগুড়ি-আমতলী-মিরগড়-পঞ্চগড় সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।

 

এই সেতু নির্মাণের ফলে ওই অঞ্চলের কৃষিপণ্য খুব সহজেই রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পৌঁছাতে পারবে। পাশাপাশি দেশের পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় পাহাড়ি মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও গতি আনতে বান্দরবানের থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীটি একনেকে অনুমোদিত হয়, যা ওই এলাকার পর্যটন শিল্প বিকাশেও দারুণ ভূমিকা রাখবে।

 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের যুগোপযোগী সংস্কার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব বা সবুজ জ্বালানি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই ধারাবাহিকতায় বাগেরহাটে রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুমোদন পেয়েছে।

 

জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে এই মেগা প্রকল্পটি জাতীয় গ্রিডে একটি বড় অবদান রাখবে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থান ও ভাবমূর্তি তুলে ধরতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সদ্য কেনা নতুন চ্যান্সারি ভবনকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারের উপযোগী করা এবং এর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য একটি পৃথক প্রকল্প পাস করা হয়েছে।

 

একনেকের এই দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ সভা শেষে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মোহাম্মদ আলীর স্বাক্ষরিত এক বিস্তারিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, সভার মূল আলোচ্য সূচির বাইরেও পরিকল্পনা মন্ত্রী কর্তৃক ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সংবলিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বিষয়ে একনেক কমিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।

 

এই ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ প্রকল্পটির অধীনে উত্তরের জেলা জয়পুরহাটের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে নন্দাহার, হারাবতী নদী, নুনগোলা খাল এবং খাড়োয়া খাল পুনরায় খনন করা হবে, যা ওই এলাকার কৃষি অর্থনীতি ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাপক অবদান রাখবে।

 

সব মিলিয়ে এবারের একনেক সভার এই ব্যাপকভিত্তিক ও সময়োপযোগী অনুমোদনগুলো একটি উন্নত, আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার পথে সরকারের নিরবচ্ছিন্ন ও অবিচল যাত্রারই এক বাস্তব ও সুস্পষ্ট প্রতিফলন।