বিগত সময়ে সাতটি ধাপে এই বিপুল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হলেও প্রশাসনিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি, জননিরাপত্তা রক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের সুবিধার্থে এবার পুরো প্রক্রিয়াটি পাঁচটি পৃথক ধাপে নামিয়ে আনা হয়েছে। অত্যন্ত শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে প্রতিটি ধাপের ভোটগ্রহণের দিন হিসেবে সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিনটিকে নির্ধারণ করেছে কমিশন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত নির্বাচন কমিশনের ১৩তম নিয়মিত সভা শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
তিনি জানান, যেসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্ধারিত আইনি মেয়াদ ইতোমধ্যেই উত্তীর্ণ হয়ে গেছে অথবা আগামী বছরের মে মাসের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যাদের সাংবিধানিক ও আইনি মেয়াদ পূর্ণ হবে, মূলত সেই সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেই এই সময়সূচির আওতায় ভোট সম্পন্ন করা হবে।
কমিশন এই নির্বাচনী চক্রের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ। কমিশনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত নির্বাচনী সময়সূচি প্রকাশ করে জানানো হয় যে, প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি।
এরপর স্বল্প বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ৪ ফেব্রুয়ারি। পবিত্র রমজান ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরবর্তী ধাপগুলোর মধ্যে যৌক্তিক ব্যবধান রাখা হয়েছে।
সেই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হবে ১৩ মে এবং পঞ্চম ও সর্বশেষ ধাপের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে আগামী ২৭ মে সারা দেশের এই বিশাল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সফল পরিসমাপ্তি ঘটবে। সুনির্দিষ্ট এই সময়সীমা তৃণমূল পর্যায়ের স্থানীয় প্রশাসনকে পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণে যথেষ্ট সময় প্রদান করবে।
নির্বাচন পরিচালনার কৌশলে এবার বিশেষ ধরনের পরিবর্তন এনেছে কমিশন। অতীতের মতো কোনো একক প্রশাসনিক বিভাগ বা নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলকে পৃথক না করে সারা দেশের সবকটি জেলায় একই সাথে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করার একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
তবে সামগ্রিক অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে জেলা সদর উপজেলার আওতাধীন ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে তালিকার শীর্ষে রাখা হবে। এর পাশাপাশি যেসব ইউনিয়ন পরিষদের আইনি কার্যকাল ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, সেগুলোকে প্রথম দিকের ধাপগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্বাচনের আওতায় এনে দ্রুত জনপ্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এর ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক স্থবিরতা দূর হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। নির্বাচনী সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য বৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক সমাবেশের বিষয়টিকেও অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সাথে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার উল্লেখ করেন, টঙ্গীর তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বইজতেমার আখেরি মোনাজাত আগামী ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই মহতী ধর্মীয় জমায়েতে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগম ঘটে, যার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর একটি বিশাল অংশকে সেখানে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতে হয়।
ফলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ ও সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে প্রথম ধাপের ভোটের তারিখ ২১ জানুয়ারিতে পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
স্থানীয় সরকার কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন সেবা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে বিপুল উদ্দীপনা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়।
নির্বাচন কমিশনের এই আগাম ও সুসংগঠিত পরিকল্পনার ফলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, মাঠ পর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে।
অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ বজায় রেখে সাধারণ নাগরিকরা যেন নির্ভয়ে তাদের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করাই বর্তমান কমিশনের মূল লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।