আগামী ডিসেম্বরের আগেই ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। একই সঙ্গে তিনি দেশের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দুটি বৃহৎ প্রকল্প-পদ্মা ব্যারাজ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যেই পদ্মা ব্যারাজের নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক ওই সেমিনারে পানিসম্পদ মন্ত্রী দেশের ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন।
গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি দীর্ঘ, ঐতিহাসিক ও জটিল প্রেক্ষাপট রয়েছে। আগামী ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক গঙ্গা চুক্তির ৩০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে এবং একই দিনে এর মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, এই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন বা জয়েন্ট রিভার কমিশন (জেআরসি) নিরবচ্ছিন্নভাবে এই চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে।
তবে এবারের চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির আদলে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বা পানির ন্যায্য হিস্যার নিশ্চয়তার শর্তটি ফিরিয়ে আনা। উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে পাঁচ বছর মেয়াদি যে পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত ছিল।
এই ধারার ফলে শুষ্ক মৌসুমেও বাংলাদেশ গঙ্গা নদী থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়ে আইনি নিশ্চয়তা পেত। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে যখন ৩০ বছর মেয়াদি বর্তমান চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়, তখন সেই চুক্তি থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ গ্যারান্টি ক্লজটি বাদ দেওয়া হয়েছিল।
ফলে গত তিন দশক ধরে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশ বরাবরই চরম পানি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মারাত্মক পরিবেশগত হুমকির মুখে পড়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, দেশের সার্বিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আগামী চুক্তিতে এই গ্যারান্টি ক্লজ পুনর্বহাল করা সরকারের সবোর্চ্চ অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টন চুক্তির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপরও সরকার সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রী পদ্মা ব্যারাজ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে বাংলাদেশের জন্য ‘মাস্টারমাইন্ড প্রজেক্ট’ বা অত্যন্ত যুগান্তকারী মেগা প্রকল্প হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, এই প্রকল্পগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকার মানুষ সরাসরি এর সুফল ভোগ করবে।
বিশেষ করে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে গড়াই নদীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শাখা নদীগুলোতে মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা ওই বিশাল অঞ্চলের লবণাক্ততা রোধ এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে অভাবনীয় ভূমিকা রাখবে।
মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকে তা চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে।
তিনি দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চের যেকোনো একটি সময়ে এই সুবিশাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান হবে। বিগত সরকারের চরম অদক্ষতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজের সম্ভাব্যতা যাচাই বা স্টাডি সম্পন্ন করতেই ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ব্যয় করা হয়েছিল।
অথচ এত দীর্ঘ সময় ও বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের পরও তা আর বাস্তবে রূপ লাভ করেনি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সেই স্থবির হয়ে থাকা কাজ চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, যা বর্তমান প্রশাসনের গভীর আন্তরিকতা ও কর্মতৎপরতার একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ।
অন্যদিকে, উত্তরের জনপদের সাধারণ মানুষের কাছে এক দীর্ঘস্থায়ী দুঃখ ও বঞ্চনার নাম তিস্তা নদী। খরস্রোতা এই নদীটিতে বর্ষাকালে যেমন তীব্র ভাঙন ও বন্যা দেখা দেয়, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় তা বিস্তীর্ণ ও শুষ্ক বালুচরে পরিণত হয়।
দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা পাড়ের লাখো মানুষ এই নিদারুণ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে আসছে। পানিসম্পদ মন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে বর্তমান সরকারের জন্য আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি জানান, তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনাকে একটি সুশৃঙ্খল ও টেকসই কাঠামোর মধ্যে আনতে সরকার দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ খুব শিগগিরই হাতে নিতে যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রথিতযশা পানি বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা দলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা ও বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে।
মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, তিস্তার মতো একটি বিশাল ও অস্থির খরস্রোতা নদীর ক্ষেত্রে রাতারাতি বা মাত্র এক-দুই মাসের মধ্যে কোনো মেগা প্রকল্পের স্টাডি সম্পন্ন করা কারিগরিভাবে একেবারেই সম্ভব নয়।
অতীতে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা পর্যাপ্ত কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়াই অপরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করেছিলেন বলেই তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে বর্তমান সরকার সব ধরনের দেশি ও বিদেশি কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করেই এই মহাপরিকল্পনার কাজ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিচ্ছে।
এই সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই মূল প্রকল্পের নকশা ও রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যেই এই সমস্ত প্রাথমিক ও গবেষণামূলক কাজ শেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ শুরু করার বিষয়ে সরকার বিশেষ নজর রাখছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৃহৎ কোনো অবকাঠামো প্রকল্প, বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদী কেন্দ্রিক স্পর্শকাতর প্রকল্পগুলো নিয়ে কাজ করার সময় প্রায়শই বিভিন্ন পরাশক্তির ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও কূটনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়।
পদ্মা ব্যারাজ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো কৌশলগত মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বহির্বিশ্বের বা কোনো নির্দিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্রের কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ সরকার অনুভব করছে কি না-সাংবাদিকদের এমন একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ মন্ত্রী এক দৃঢ়, স্বাধীন ও আপসহীন অবস্থান ব্যক্ত করেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, পদ্মা এবং তিস্তা নদীর তীরে যারা যুগ যুগ ধরে বসবাস করছেন, তারা বাংলাদেশেরই সাধারণ নাগরিক ও খেটে খাওয়া মানুষ। এই সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষিকাজ এবং পরিবেশগত অধিকার রক্ষা করাই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
মন্ত্রীর মতে, দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করার যে নৈতিক চাপ, সেটাই তাঁর এবং বর্তমান সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় ও একমাত্র চাপ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বহির্বিশ্বের কোনো ধরনের রক্তচক্ষু বা কূটনৈতিক চাপ দেশের মানুষের এই মৌলিক অধিকার আদায়ের পথকে কখনোই রুদ্ধ করতে পারবে না।
দেশের জনগণের বৃহত্তর কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার যে পবিত্র ব্রত সরকার গ্রহণ করেছে, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার নিজস্ব সক্ষমতা, মেধা ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কাজ করে যাবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রীর এই সুচিন্তিত ও জোরালো বক্তব্য থেকে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কৌশলগত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল এবং নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যাপারে শতভাগ আপসহীন নীতি অনুসরণ করছে।