শনিবার সকালে পরীক্ষা শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুরুতর অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর ফলে সারা দেশ থেকে চরম কষ্ট ও অর্থ ব্যয় করে ঢাকায় আসা চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
বেকারত্বের এই কঠিন সময়ে একটি সরকারি চাকরির আশায় বুক বেঁধে থাকা লাখো তরুণের স্বপ্ন এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি এবং অনেক আশা নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার পর এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে তারা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই তারা রাজপথে নেমে আসেন এবং নিজেদের যৌক্তিক দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিক্ষোভ শুরু করেন। শনিবার বেলা এগারোটায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একাদশ গ্রেডের এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে মোট দুই শত বিয়াল্লিশটি শূন্য পদের বিপরীতে এই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা ছিল প্রায় তিন লাখ চাকরিপ্রার্থীর। এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর জন্য রাজধানী ঢাকার প্রায় এক শতটি কেন্দ্রে পরীক্ষা গ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পরীক্ষার দিন ভোর থেকেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুঞ্জন ও তথ্য ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থে পরীক্ষা শুরুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর পরীক্ষাটি স্থগিত ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পরপরই পরীক্ষা দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসা চাকরিপ্রার্থীরা চরম হতাশা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
সকাল থেকেই তাদের একটি বিশাল অংশ ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে শাহবাগ মোড়ে এসে জড়ো হতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে তারা মূল সড়ক অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন।
বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীদের এই আকস্মিক সড়ক অবরোধের কারণে রাজধানী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শাহবাগে সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। প্রথম দফায় পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীদের বুঝিয়ে মূল সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন।
তবে পরীক্ষার্থীদের ভেতরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশা এতই তীব্র ছিল যে, কিছুক্ষণ পর তারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে দ্বিতীয় দফায় শাহবাগ মোড়ের সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় পুরো শাহবাগ ও এর আশপাশের এলাকায় এক থমথমে ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে আরও অনেক পরীক্ষার্থী এসে এই বিক্ষোভে যোগ দিতে থাকেন। আন্দোলনরত অনেক পরীক্ষার্থীর হাতেই সেই বাতিল হওয়া পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেখা যায়, যা তারা ক্ষোভের সঙ্গে প্রদর্শন করছিলেন।
কেবল শাহবাগেই নয়, রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত সরকারি বাঙলা কলেজের সামনেও বহু পরীক্ষার্থী জড়ো হয়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীরা এই নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালোভাবে চারটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছেন।
তাদের প্রথম এবং প্রধান দাবি হলো, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের অবিলম্বে শনাক্ত করে কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আগামী দুই দিনের মধ্যে স্থগিত হওয়া এই নিয়োগ পরীক্ষার নতুন তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে হবে, যাতে পরীক্ষার্থীরা দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার হাত থেকে মুক্তি পান। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ পরীক্ষাগুলোতে কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই জোরদার করতে হবে যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁস বা অন্য কোনো জালিয়াতির ঘটনা ঘটতে না পারে।
সর্বশেষ দাবিতে তারা পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন। পরীক্ষার্থীদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মাধ্যমে সহজেই অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ রয়েছে; অথচ পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে এসব যন্ত্র শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় স্ক্যানার বা আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জামাদির কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
এই প্রযুক্তিগত শূন্যতা অবিলম্বে দূর করে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তারা। চাকরিপ্রার্থীদের এই তীব্র ক্ষোভ এবং রাজপথের আন্দোলনের মুখে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-পাঁচ) মাজহারুল হক উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন যে, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে স্থগিত হওয়া এই নিয়োগ পরীক্ষার নতুন তারিখ নির্ধারণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
তিনি অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই স্থগিত হওয়া এই নিয়োগ পরীক্ষার নতুন সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে এবং পরীক্ষার্থীদের বিষয়টি দ্রুততম সময়ের মধ্যে অবহিত করা হবে।
তবে তার এই আশ্বাসেও বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা শাহবাগ মোড় ত্যাগ করবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও পর্যালোচনার পর তারা পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবেন।
তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা সন্তোষজনক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপাতত তারা রাজপথে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন। এই বাতিল হওয়া নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা পরীক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় আর্থিক ও মানসিক কষ্টের চিত্র উঠে এসেছে।
ঝিনাইদহ জেলা থেকে ঢাকায় পরীক্ষা দিতে আসা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী শিক্ষার্থী তানভীর হোসাইন তার চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দেশের সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোতে বিদ্যমান সীমাহীন অনিয়ম, চরম অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘসূত্রতার দায় কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা সরকার এড়াতে পারে না।
বর্তমান সময়ে একদিকে যেমন নতুন কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে না, অন্যদিকে যে সামান্য কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করা হচ্ছে, সেগুলোও সুষ্ঠু ও দুর্নীতিমুক্তভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে ছলনা। এর ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য ঘটনা।
এই আকস্মিক পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার কারণে দূরদূরান্ত থেকে ধারদেনা করে আসা অসংখ্য পরীক্ষার্থীকে চরম আর্থিক ও মানসিক ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক বেকার তরুণ যাতায়াত এবং ঢাকায় থাকা-খাওয়ার পেছনে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু খরচ করে পরীক্ষা দিতে এসেছেন; কিন্তু শেষ মুহূর্তে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে তাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো, তার দায়ভার কে গ্রহণ করবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তানভীর।
তানভীর আরও অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন যে, দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণ একটি সম্মানজনক কর্মসংস্থানের আশায় দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে পড়াশোনা করছেন এবং নিজেদের পরিবারের কষ্টার্জিত সীমিত অর্থ ব্যয় করছেন।
অথচ নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে এ ধরনের চরম অনিশ্চয়তা এবং দুর্নীতির চিত্র তাদের হতাশাকে দিন দিন আরও বাড়িয়ে তুলছে। একটি জাতীয় পর্যায়ের নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যে ধরনের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা, গোপনীয়তা ও নিশ্ছিদ্র প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, তার চরম অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, পরীক্ষা আকস্মিক স্থগিত করা এবং সামগ্রিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার দায় কোনোভাবেই এড়ানোর সুযোগ নেই। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হলে জবাবদিহিহীনতা এবং অনিশ্চয়তার বদলে মেধার ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নীলফামারী জেলা থেকে আসা আরেকজন পরীক্ষার্থী। তিনি অত্যন্ত হতাশার সুরে প্রশ্ন রাখেন, দেশের বেকার তরুণ সমাজের সঙ্গে এই ধরনের নিষ্ঠুর তামাশা কি আদৌ কোনোদিন বন্ধ হবে? নাকি বারবার সেই পুরোনো দুর্নীতির বন্দোবস্তই চলতে থাকবে?
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এই দেশে কোনো একটি নেতিবাচক প্রবণতা একবার চালু হলে তা বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সুদূর নীলফামারী থেকে হাজার হাজার টাকা খরচ করে কেবল একটি পরীক্ষার আশায় ঢাকায় আসার পর এখন শূন্য হাতে ফিরে যাওয়ার যাতায়াতের খরচ তাকে কে দেবে, তার কোনো উত্তর কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। সামগ্রিকভাবে এই ঘটনাটি দেশের নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং বেকার তরুণদের ভবিষ্যতের ওপর এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।