এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় প্রকাশ্যে এক ভয়াবহ ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। পূর্বশত্রুতা এবং একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের সাক্ষ্য দেওয়ার জের ধরে এই হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন একজন নিরীহ ব্যবসায়ী এবং ছুরিকাঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হয়েছেন তাঁর তরুণ ছেলে।
এই নির্মম হামলার ঘটনাটি স্থানীয় সাধারণ ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে। একটি স্বাধীন ও আধুনিক রাষ্ট্রে সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে যারা অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তাদের ওপর এ ধরনের প্রকাশ্য হামলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায়, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর রাত আনুমানিক পৌনে নয়টার দিকে মোহাম্মদপুরের বসিলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ব্যস্ততম ফলপট্টি বা মহিরগোলা এলাকায় এই রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে।
দিনের বেলার কর্মব্যস্ততা শেষে সাধারণ মানুষ যখন নিজেদের গন্তব্যে ফিরছিলেন এবং ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিদিনের বেচাকেনা গুছিয়ে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই একদল সশস্ত্র ও সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী অতর্কিতভাবে এই হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ও আহতদের স্বজনদের দাবি অনুযায়ী, এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন কাঁচামাল ব্যবসায়ী পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী সুমন আলী এবং তাঁর চব্বিশ বছর বয়সী সন্তান ফাহিম। সন্ত্রাসীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এসে এই নারকীয় তাণ্ডব চালায়।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসীরা আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হামলায় ব্যবসায়ী সুমন আলীর শরীরে সরাসরি গুলি করা হয় এবং তাঁর ছেলে ফাহিমকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে সন্ত্রাসীরা বীরদর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
এই নির্মম ও বর্বরোচিত হামলার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক মাস আগের আরেকটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের রেশ। আহতদের স্বজনরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অভিযোগ করেছেন যে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্ত্রাসীদের নাম প্রকাশ করার কারণেই মূলত প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এই হামলা চালানো হয়েছে।
১৫ সেপ্টেম্বরের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ফরহাদ নামের এক ব্যক্তি, যিনি সম্পর্কে গুলিবিদ্ধ ব্যবসায়ী সুমন আলীর ভগ্নিপতি। জানা যায়, ফুটপাতে ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য দোকান বসানো, নিয়মিতভাবে অবৈধ চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল।
মূলত রাজধানীর কেরানীগঞ্জ এলাকার আর্শীনগর অংশে আধিপত্য কায়েম করতে চেয়েছিল ‘এলেক্স গ্রুপ’ নামের একটি ভয়ংকর ও সংঘবদ্ধ স্থানীয় কিশোর বা যুব সন্ত্রাসী চক্র। এই চক্রের অবৈধ অন্যায় ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করার কারণেই গত ১৫ সেপ্টেম্বর আর্শীনগরের একটি সেলুনের ভেতর প্রকাশ্যে ও দিনের আলোতে ফরহাদকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছিল এলেক্স গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।
ফরহাদ হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর পরিবার ও স্বজনরা ন্যায়বিচারের আশায় আইনের আশ্রয় গ্রহণ করেন। সুমন আলী এবং তাঁর পরিবার সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত সন্ত্রাসীদের চিনে ফেলেন এবং সাহসিকতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে খুনিদের নাম প্রকাশ করেন।
পুলিশি তদন্তে এবং পরিবারের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ফরহাদ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে আরমান নামের এক চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারকৃত আরমান বর্তমানে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কারাগারে বন্দিজীবন যাপন করছে।
কিন্তু আইনের এই স্বাভাবিক গতিপথ মেনে নিতে পারেনি এলেক্স গ্রুপের অন্য সদস্যরা। নিজেদের এক সদস্য পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ায় এবং ফরহাদের স্বজনরা খুনিদের বিরুদ্ধে শক্ত আইনি অবস্থান গ্রহণ করায় ওই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
তারা প্রতিনিয়ত মামলা তুলে নেওয়ার জন্য এবং সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য পরিবারটিকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল। কিন্তু সুমন আলী ন্যায়ের পথ থেকে সরে না আসায় শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসীরা এই চরম প্রতিশোধমূলক সশস্ত্র হামলার পথ বেছে নেয়।
আহত ব্যবসায়ী সুমন আলী এবং তাঁর পরিবারের শেকড় মূলত মুন্সীগঞ্জ জেলায়। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রাজাবাড়ি দিঘীরপাড় নামক গ্রামে তাঁদের পৈতৃক নিবাস। তবে জীবন ও জীবিকার তাগিদে এবং কিছুটা সচ্ছলতার আশায় তাঁরা দীর্ঘকাল ধরে ঢাকায় বসবাস করছেন।
বর্তমানে তাঁরা রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন বসিলা এলাকায় সপরিবারে বসবাস করেন এবং স্থানীয় ফলপট্টি এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন।
কিন্তু সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে একটি সৎ ও পরিশ্রমী পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপন আজ চরম হুমকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। নিহতের ভাই এবং বর্তমান হামলায় আহতদের উদ্ধারে অংশ নেওয়া অপর কাঁচামাল ব্যবসায়ী পারভেজ গণমাধ্যমের কাছে এই ভয়াবহ হামলার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, বৃহস্পতিবার রাতের ওই হামলায় এলেক্স গ্রুপের চিহ্নিত সন্ত্রাসী সোহেল, রমিজ, রাব্বি, মুন্না এবং ইয়ামিনসহ প্রায় সাত থেকে আটজন সশস্ত্র যুবক সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল।
পারভেজ আরও জানান, রাত পৌনে নয়টার দিকে এই চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই বসিলা মহিরগোলা এলাকায় তাঁদের নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এসে অতর্কিতভাবে আক্রমণ শুরু করে। শুরুতে তারা বাবা ও ছেলেকে বেধড়ক মারধর করতে থাকে এবং একপর্যায়ে হত্যার উদ্দেশ্যে সুমন আলীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
একই সঙ্গে ছেলে ফাহিম বাবাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতরভাবে জখম করা হয়। রক্তক্ষয়ী এই হামলার পর সন্ত্রাসীরা চলে গেলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তায় স্বজনরা মুমূর্ষু অবস্থায় বাবা ও ছেলেকে উদ্ধার করেন।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রচুর রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাত আনুমানিক দশটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে জরুরি বিভাগে অত্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণে তাদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে স্বজনরা জানিয়েছেন, দুজনের অবস্থাই যথেষ্ট গুরুতর এবং তারা এখনো সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত নন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ, পুলিশ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান এই ভয়াবহ হামলার ঘটনার সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বৃহস্পতিবার রাতে গুলিবিদ্ধ ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হওয়া বাবা ও ছেলেকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়েছিল। বর্তমানে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অধীনে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে এবং পুলিশি পাহারায় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরিদর্শক হাবিবুর রহমান আরও নিশ্চিত করেছেন যে, এই সশস্ত্র হামলা এবং হত্যাচেষ্টার বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সংশ্লিষ্ট মোহাম্মদপুর থানাকে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ এই ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ লিপিবদ্ধ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, এই হামলার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা হবে।
রাজধানীর বুকে এমন একটি রোমহর্ষক ও প্রকাশ্য সশস্ত্র হামলার ঘটনা পুরো সমাজব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা, ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্রগুলোকে সমূলে উৎপাটন করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের আরও কঠোর ও আপসহীন ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
বিশেষ করে, যারা অপরাধের শিকার হয়ে বা প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় সাধারণ মানুষ অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলতে বা সাক্ষ্য দিতে নিরুৎসাহিত হবে, যা পরিশেষে অপরাধীদেরই আরও বেপরোয়া করে তুলবে।
এখন সাধারণ মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা, বসিলায় সংঘটিত এই বর্বরোচিত হামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং দোষী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো অপরাধী চক্র এ ধরনের দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সাহস না পায়।