তীব্র বাতাসের চাপে বিকট শব্দে খুলে গেল উড়োজাহাজের দরজা। জীবন বাঁচানোর সেই যাত্রাপথ মুহূর্তের মধ্যেই পরিণত হলো এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে। হাজার হাজার ফুট ওপরে উন্মুক্ত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে সেটি ধরে রেখেছিলেন রোগীর স্বজনরা।
তাদের সেই আপ্রাণ চেষ্টা উড়োজাহাজটিকে নিশ্চিত দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করলেও, শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি সেই রোগীকে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা যাওয়ার পথে বাংলাদেশের আকাশসীমায় এমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর ও মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হলো একটি ভারতীয় এয়ার অ্যাম্বুলেন্স।
রোববার বিকেলে ঘটে যাওয়া এই অভাবনীয় ঘটনার পর উড়োজাহাজটি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ছোট আকারের এই বিশেষায়িত উড়োজাহাজটি ভারতের ‘এসকেবি ইনফ্র্যাকন প্রাইভেট লিমিটেড’-এর মালিকানাধীন ছিল।
সাধারণত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে কলকাতা বা অন্যান্য বড় শহরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সময় ও দূরত্ব কমানোর জন্য উড়োজাহাজগুলো নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে থাকে।
রোববার বিকেলেও মুমূর্ষু রোগী অঞ্জনা ভৌমিককে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আগরতলা থেকে কলকাতার উদ্দেশে উড়াল দিয়েছিল এই উড়োজাহাজটি। কিন্তু যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই, যখন এটি বাংলাদেশের আকাশসীমার ওপর দিয়ে উড়ছিল, তখন হঠাৎ করেই এর একটি দরজা খুলে যায়।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝআকাশে উড়োজাহাজের দরজা খুলে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং ভয়ংকর। এর ফলে কেবিনের ভেতরের বাতাসের চাপ হঠাৎ করে কমে যায়, যা আরোহীদের জন্য মারাত্মক শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য শারীরিক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
এই চরম সংকটের মুহূর্তে উড়োজাহাজে থাকা যাত্রীরা এক অবর্ণনীয় আতঙ্কের মুখোমুখি হন। তবে ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতেও রোগীর দুই স্বজন, শান্তা ভৌমিক ও দ্বীপ জয়তি মুশরিপ, অসাধারণ সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দেন।
প্রবল বাতাসের চাপ এবং চরম আতঙ্কের মধ্যেও তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খুলে যাওয়া দরজাটি আপ্রাণ চেষ্টায় ধরে রাখেন। তাদের এই বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টার কারণেই উড়োজাহাজটির ভারসাম্য রক্ষা পায় এবং একটি সম্ভাব্য বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পান ভেতরে থাকা পাইলট ও অন্য আরোহীরা।
ওই ভয়াবহ মুহূর্তে কেবিনের ভেতর তীব্র বাতাস ও শব্দের কারণে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে উড়োজাহাজটির দায়িত্বে থাকা দুই অভিজ্ঞ পাইলট, ক্যাপ্টেন পূন্য অনূপ ও ক্যাপ্টেন তনুজ শর্মা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢাকার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
তারা যান্ত্রিক ত্রুটির কথা জানিয়ে জরুরি অবতরণের জন্য ঢাকা কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এই চরম সংকটের মুহূর্তে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে উড়োজাহাজটিকে নিরাপদে অবতরণের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও অনুমতি প্রদান করে।
রানওয়েতে জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়, যাতে অবতরণের পরপরই যেকোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করা যায় এবং রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের মুখপাত্র মো. রিয়াজ উদ্দিন এই শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, উড়োজাহাজটি নিরাপদে ঢাকায় অবতরণ করার পরপরই সেখানে এক জরুরি উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপে অসুস্থ রোগী অঞ্জনা ভৌমিককে কালক্ষেপণ না করে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আকাশপথে সৃষ্ট চরম আতঙ্ক, কেবিনের চাপের আকস্মিক পরিবর্তন এবং চিকিৎসার বিলম্ব-সব মিলিয়েই হয়তো এই মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে এনেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর এক রুদ্ধশ্বাস যাত্রার এমন করুণ সমাপ্তি সবাইকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে।
উড়োজাহাজটিতে মোট সাতজন আরোহী ছিলেন। তারা হলেন-পাইলট ক্যাপ্টেন পূন্য অনূপ ও ক্যাপ্টেন তনুজ শর্মা, রোগী অঞ্জনা ভৌমিক, তার দুই স্বজন শান্তা ভৌমিক ও দ্বীপ জয়তি মুশরিপ, চিকিৎসক ডা. ফিরোজ খান এবং প্যারামেডিকস আজিম খান।
বিমানবন্দর সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে রোগীর মৃত্যু হলেও উড়োজাহাজে থাকা পাইলট, স্বজন এবং চিকিৎসা দলের অন্য সদস্যরা সম্পূর্ণ সুস্থ ও অক্ষত রয়েছেন। ভয়াবহ ওই অভিজ্ঞতার পর তাদের প্রয়োজনীয় মানসিক ও প্রাথমিক চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
এই ঘটনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আন্তর্জাতিক সীমানা ও আইনি জটিলতা। যেহেতু এটি ভারতের একটি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ছিল এবং তারা কেবল বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করছিল, তাই আরোহীদের কারও কাছেই বাংলাদেশের কোনো বৈধ ভিসা বা পাসপোর্ট ছিল না।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের জরুরি অবতরণের ক্ষেত্রে যাত্রীদের আইনি বৈধতার চেয়ে তাদের জীবন রক্ষা ও মানবিক সহায়তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষও ঠিক সেই আন্তর্জাতিক ও মানবিক শিষ্টাচারেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আইনি প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বিষয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, যেহেতু তাদের কাছে বৈধ ভ্রমণ নথি নেই, তাই বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট দূতাবাস এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।
সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষে মৃতদেহ এবং সুস্থ আরোহীদের অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে তাদের নিজ দেশ ভারতে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। উড়োজাহাজটির মডেল এবং কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
আকাশপথে মুমূর্ষু রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে যেখানে সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেখানে এমন একটি যান্ত্রিক ত্রুটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এভিয়েশন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি আকাশপথে বিশেষায়িত ফ্লাইটের কারিগরি নিরাপত্তার বিষয়ে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। উড্ডয়নের আগে উড়োজাহাজের প্রতিটি দরজা, লক এবং যান্ত্রিক ব্যবস্থা কতটা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সেটিই আবার নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
একই সঙ্গে, চরম বিপদের মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যে দ্রুততম যোগাযোগ ও মানবিক সহায়তার যে নজির স্থাপিত হলো, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।