সরকারের সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দৈনন্দিন কার্যক্রমে আরও বেশি গতিশীলতা, সমন্বয় এবং আধুনিকায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছে রাজধানীর আগারগাঁও এলাকার পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে।
রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই মেগাপ্রকল্পের নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে উপস্থিত হয়ে সরকারের এই সুদূরপ্রসারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও আধুনিকায়নের এই উদ্যোগে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রিপরিষদ সচিব তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এটি বর্তমান সরকারের একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখার অংশ।
প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে এই উদ্যোগটির রূপরেখা প্রণয়নে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন, যেন সরকারের প্রতিটি বিভাগ ও মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত পদ্ধতির আওতায় অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এবং নির্বিঘ্নে তাদের উপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে পারে।
এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারের নিজস্ব তহবিল বা অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণের উদ্যোগটি মূলত দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি ইতিবাচক প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সবকিছু সরকারের পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হলে আগামী ২০২৯ সালের মধ্যেই নতুন সচিবালয় ভবনে দাপ্তরিক কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু করা সম্ভব হবে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
নতুন এই সচিবালয় নির্মাণের জন্য নির্ধারিত আগারগাঁওয়ের পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠের মোট ৩১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। একটি আধুনিক, পরিবেশবান্ধব এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে সেখানে সর্বাধুনিক স্থাপত্যশৈলীর প্রয়োগ ঘটানো হবে।
নতুন সচিবালয় প্রাঙ্গণের প্রাথমিক নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে মোট চৌদ্দটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে, যার প্রতিটি হবে বারো তলা বিশিষ্ট। বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং দর্শনার্থীদের যানবাহনের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার জন্য সেখানে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ পার্কিং বা গাড়ি রাখার স্থান তৈরি করা হবে, যেখানে একসঙ্গে তিন হাজার আটশোটি গাড়ি নিরাপদে রাখা সম্ভব হবে।
এর পাশাপাশি প্রশাসনিক এই বিশাল চত্বরের ভেতরে ধর্মীয় উপাসনার জন্য দুটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও দাপ্তরিক অনুষ্ঠানের জন্য একটি সুপরিসর বহুমুখী মিলনায়তন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মানসম্মত ভোজনশালা বা খাবারঘর এবং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ডাকঘর স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সচিবালয় এলাকায় যেন কোনোভাবেই যানজটের সৃষ্টি না হয় এবং যানবাহন চলাচল যেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও মসৃণ থাকে, সে জন্য মূল ভবনের চারপাশে বেশ কিছু ভূগর্ভস্থ সড়ক এবং পারাপারের পথ বা আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে।
সচিবালয় স্থানান্তরের পর রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বর্তমান সচিবালয়ের ঐতিহাসিক ভবন ও জায়গার ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়েও মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রাথমিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, পুরান ঢাকা এলাকায় বর্তমানে প্রশাসনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর এবং আদালত অত্যন্ত ঘিঞ্জি ও স্থানাভাবের মধ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অপর্যাপ্ত স্থানের কারণে বিচারিক কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সেবা প্রদান অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমান সচিবালয়টি আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরিত হলে পুরান ঢাকার সেই আটকে থাকা প্রশাসনিক কার্যালয় এবং আদালতগুলোকে এই স্থানে সরিয়ে আনার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
এর ফলে পুরান ঢাকার যানজট ও জনজট যেমন অনেকাংশে হ্রাস পাবে, তেমনি বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ নাগরিকরা অনেক সহজে সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। তবে ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয়তা ও নগর পরিকল্পনার সার্বিক দিক বিবেচনা করে পরবর্তীতে এই স্থানে আরও কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সচিবালয় স্থানান্তর ছাড়াও রোববারের এই মন্ত্রিসভা বৈঠকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট আরও বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ও অধ্যাদেশ অনুমোদন লাভ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব।
নারী অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়েছে। ভাষাগত এই পরিবর্তনটি সমাজের সর্বস্তরে নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমসাময়িক আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় মন্ত্রিসভার এই বৈঠকে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব এই অধ্যাদেশের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের শৃঙ্খল কতটা নাজুক ও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, তা সকলের কাছেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই চরম অস্থিতিশীলতার হাত থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির কোনো বিকল্প নেই। আইন প্রণয়নকারী বিভাগের প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে খুব শিগগিরই এটি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই নতুন আইনের আওতায় সরকারি ভবন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর ও উৎসাহিত করা হবে। প্রকল্পগুলো মূলত দুটি ভিন্ন কাঠামোতে বাস্তবায়িত হবে-একটি হলো পরিচালন ব্যয়ভিত্তিক কাঠামো এবং অপরটি হলো মূলধনি ব্যয়ভিত্তিক কাঠামো।
এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও মন্ত্রিসভা একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনুস্বাক্ষর করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নির্দিষ্ট বিপজ্জনক রাসায়নিক এবং কীটনাশক আমদানির ক্ষেত্রে পূর্বানুমতি পদ্ধতি বিষয়ক বৈশ্বিক চুক্তি ‘রটারডাম সনদ’-এ বাংলাদেশের যোগদানের প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে।
এই আন্তর্জাতিক সনদে বিশ্বের বহু দেশ আগেই স্বাক্ষর করলেও বাংলাদেশ এতদিন এর বাইরে ছিল। এখন থেকে এই সনদের পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ যেকোনো বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান বা ক্ষতিকর কীটনাশক আমদানির পূর্বে এর বৈজ্ঞানিক ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে আন্তর্জাতিকভাবে তথ্য প্রাপ্তির সুযোগ পাবে।
এর ফলে দেশের মাটি, পানি, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য না বুঝে দেশে প্রবেশের আর কোনো সুযোগ থাকবে না। সবশেষে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের নকশা ও সীমানা সুরক্ষার বিষয়েও মন্ত্রিসভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের করা জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশাটিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্থাপত্যকর্ম ও অমূল্য শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব উল্লেখ করেন যে, দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এবং স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত এই অনন্য সাধারণ স্থাপত্যশৈলী দেখতে আসেন।
এই ঐতিহাসিক ভবনের মূল ধারণা ও আঙ্গিক সম্পূর্ণভাবে অক্ষুণ্ণ রেখেই নতুন সময়ের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে কিছু সংযোজন ও সম্প্রসারণের একটি মহাপরিকল্পনা মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে।
তবে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্বে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা, এবং প্রকৌশল কাঠামোর বিস্তারিত নকশা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করে সতর্কতার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।