রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাসিনার প্রত্যাবর্তনের গুঞ্জনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ দেবে না সরকার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম

হাসিনার প্রত্যাবর্তনের গুঞ্জনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ দেবে না সরকার
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন। ছাত্র ও জনতার এক ঐতিহাসিক এবং রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন পরিসরে নানা ধরনের জল্পনাকল্পনা ডালপালা মেলছে।

 

বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বর মাসে তার বাংলাদেশে ফিরে আসার একটি জোরালো গুঞ্জন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এই ধরনের সংবেদনশীল ইস্যুকে কেন্দ্র করে দেশের ভেতরে কোনোভাবেই নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর ন্যূনতম কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না বলে অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে বর্তমান সরকার।

 

সরকারের এই অনমনীয় অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের এই ঘোষণা জনমনে এক ধরনের স্বস্তি ও নিরাপত্তার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে।

 

রোববার, ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারের এই কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা করেন।

 

তিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্য এবং সরকারের গৃহীত আগাম নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপগুলোর একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন।

 

সাংবাদিকদের এক সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন যে, সমাজের অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতো সরকারের শীর্ষ মহলও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম থেকে শুনতে পাচ্ছে যে, ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাইছেন।

 

তবে এই গুঞ্জনকে পুঁজি করে কেউ যাতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করতে না পারে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

 

সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার বিষয়ে বর্তমান সরকারের আনুষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলোর কথাও এই সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, দেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী সময়ে যে অগণিত সাধারণ নাগরিক, শিক্ষার্থী ও আপামর জনতা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা বর্তমান প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

 

এই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই গণহত্যাকারী ও ফ্যাসিস্ট হিসেবে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আইনি কাঠামোর আওতায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানোর জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রতিবেশী দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েক দফা অত্যন্ত জোরালো অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, এই বন্দি প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান দিনের আলোর মতো পরিষ্কার এবং সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করেই এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই সরকার এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর।

 

ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে সরকারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক অপতৎপরতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

 

তিনি উল্লেখ করেন যে, ক্ষমতাচ্যুত ও জনবিচ্ছিন্ন ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর অপপ্রয়াস এবং গুজব ছড়ানোর কৌশল একেবারে প্রথম থেকেই চালু ছিল। এই পরাজিত শক্তিগুলো মূলত মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যমে ফায়দা লুটতে চায়।

 

তাদের মূল লক্ষ্যই হলো একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত রাষ্ট্রে কৃত্রিমভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের এই ধরনের কোনো হীন উদ্দেশ্য সরকার কখনোই সফল হতে দেবে না।

 

দেশব্যাপী গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আবেগময় একটি বিষয়কে স্পর্শ করেন, যা মূলত গত গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে ধারণ করে।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, "বাংলাদেশে কোনো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির ন্যূনতম সুযোগও কাউকে দেওয়া হবে না। সেটি কোনো অপশক্তি হোক কিংবা পতিত স্বৈরাচারী শক্তি, ফ্যাসিস্ট, পলাতক অপরাধী বা জঘন্য গণহত্যাকারী-কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।"

 

তিনি দেশের অগণিত শহীদ এবং তাদের আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, যে তীব্র গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশের শত শত নিরীহ নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করে যারা কাপুরুষের মতো দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের আর কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক অপতৎপরতা চলতে দেওয়া হবে না।

 

এই দেশ সাধারণ মানুষের, এই দেশ সেইসব তরুণদের যারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে। তাই তাদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করে কোনো পলাতক অপরাধীকে পুনরায় সমাজে বা রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না।

 

সরকারের এই বক্তব্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, বিগত সরকারের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, খুন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের প্রতিটি ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও আইনি বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান প্রশাসন কতটুকু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও একটি অত্যন্ত পরিষ্কার বার্তা বহন করে।

 

একটি রাষ্ট্র যখন গভীর রাজনৈতিক সংকট ও গণঅভ্যুত্থান পার করে একটি নতুন গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করে, তখন তার প্রাথমিক চ্যালেঞ্জই থাকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার পাশাপাশি দেশের ভেতরের ক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত রাখা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।

 

বাংলাদেশ সরকার সেই কঠিন কাজটি অত্যন্ত পেশাদারিত্ব এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে করার চেষ্টা করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য যে প্রত্যর্পণ চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া।

 

তবে সরকার প্রমাণ করতে চাইছে যে, তারা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়, বরং ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে চায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব এবং অপপ্রচার আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের এই গুঞ্জনও মূলত সেই অপপ্রচারেরই একটি অংশ বলে সরকার মনে করছে, যার উদ্দেশ্য হলো বর্তমান প্রশাসনের উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কাজগুলো থেকে সাধারণ মানুষের মনোযোগ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা।

 

তবে সরকার এই বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। ডিজিটাল স্পেসে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য প্রদানের মাধ্যমে সচেতন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জনগণ যাতে কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্যে প্ররোচিত হয়ে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ না করে, সে বিষয়ে প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সংবাদ সম্মেলন মূলত সেই বৃহত্তর জাতীয় সচেতনতা ও প্রস্তুতিরই একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিশেষে, এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, বাংলাদেশ তার অন্ধকার অতীতকে পেছনে ফেলে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং স্থিতিশীল সমাজ বিনির্মাণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই যাত্রাপথে কোনো পরাজিত বা ফ্যাসিবাদী শক্তির ছায়া সরকার আর কখনোই পড়তে দেবে না।