মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠক, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৩ এএম

বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠক, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত
ছবি : Collected

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক এবং পরীক্ষিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন যুগে প্রবেশের লক্ষ্যে টোকিওতে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 

জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় কান্তেইয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে এই শীর্ষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

 

অত্যন্ত উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উভয় দেশের শীর্ষ নেতা বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, বৃহৎ অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকা এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দ্রুতগামী প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ব্যাপক শিল্পায়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জাপান সরকার ও দেশটির বেসরকারি খাতকে আরও বেশি মাত্রায় এবং সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

 

দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে উভয় দেশের সরকারপ্রধান একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী দিনের বাংলাদেশের রূপকল্প আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে সমগ্র এশিয়া অঞ্চলের মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে।

 

একই সঙ্গে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল মাইলফলক ছাড়িয়ে যাওয়ার এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

 

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের এক গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের হৃদয়ে জাপানের জন্য একটি বিশেষ ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান সংরক্ষিত রয়েছে।

 

১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর যে কয়েকটি দেশ সর্বপ্রথম নতুন রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল, জাপান তাদের মধ্যে অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান, বিশ্বস্ত এবং অবিচল উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে।

 

পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধা, অবিচল আস্থা, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার যে অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা, মূলত তার ওপর ভিত্তি করেই দুই দেশের এই সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

 

এই প্রসঙ্গে তিনি তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার ঐতিহাসিক জাপান সফর এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে তাদের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

 

পূর্বসূরিদের সেই গৌরবোজ্জ্বল পদাঙ্ক অনুসরণ করেই তিনি দুই দেশের বর্তমান সম্পর্ককে এক নতুন ও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা যেকোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী মূল্যের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা একেবারেই অপরিহার্য।

 

এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে জাপানের দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন ও গঠনমূলক সহযোগিতার জন্য তিনি জাপান সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে, সমগ্র এশিয়া অঞ্চলে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে গৃহীত ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ নামক উদ্যোগের আওতায় জাপান সম্প্রতি বাংলাদেশকে যে পঞ্চাশ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি আর্থিক সহায়তা বা ঋণ প্রদান করেছে, তিনি তার আন্তরিক প্রশংসা করেন।

 

ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও কারিগরি অংশগ্রহণ আরও বহুগুণে বাড়ানোর জন্য তিনি জোরালো আহ্বান জানান।

 

একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে একটি অত্যাধুনিক ‘বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক’ প্রতিষ্ঠার অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রস্তাব দিয়েছেন।

 

এই অভিনব উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি, স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ ও মেধাবী প্রজন্ম, সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনশক্তির এক অভূতপূর্ব সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

 

প্রস্তাবিত এই বিশেষায়িত টেক পার্কে মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনের মতো অগ্রসর ও ভবিষ্যৎমুখী খাতগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

 

শুধু তথ্যপ্রযুক্তিই নয়, মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল এবং এ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে জাপানের যে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত ও অগ্রসর সক্ষমতা রয়েছে, তার সঙ্গেও বাংলাদেশের পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।

 

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত এবং সুষম করতে আধুনিক, দ্রুতগামী ও সমন্বিত যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই খাতে তার সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি দেশের প্রধান ছয়টি বিভাগীয় শহরকে একটি আধুনিক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত করার এবং দেশব্যাপী একটি বিস্তৃত উড়াল সড়ক বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানান।

 

এ ধরনের বৃহৎ ও জটিল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর নিখুঁত পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান, ব্যাপকভিত্তিক বিনিয়োগ এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ক্ষেত্রে তিনি জাপানের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছেন।

 

জাপানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অত্যন্ত আধুনিক ও সুরক্ষিত পরিবহন ব্যবস্থা পরিচালনার যে দীর্ঘ ও সফল অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।

 

বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে অত্যন্ত উষ্ণ স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একটি বিনিয়োগবান্ধব, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তার সরকার নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সংস্কার, সময়োপযোগী করনীতি প্রণয়ন, দ্রুততম সময়ে শুল্ক ছাড়করণ এবং মুনাফা ও অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং দক্ষতা বাড়াতে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেন।

 

এছাড়া, বহুল প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর করার বিষয়ে তিনি গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির সুফল যেন দুই দেশের সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে, তা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষকেই অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সমন্বয়ের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যেতে হবে।

 

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিভিন্ন জটিল বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক বিশ্বশান্তি রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন কঠোরভাবে সমুন্নত রাখার বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন ও অবিচল অঙ্গীকারের কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।

 

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাশি তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর খলিলুর রহমানের নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাপান যে অকুণ্ঠ ও বলিষ্ঠ সমর্থন প্রদান করেছে, সেজন্য তিনি জাপান সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

ডক্টর খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে বহুপাক্ষিক বৈশ্বিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানাবিধ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী দিনগুলোতে জাপানের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

 

একই সঙ্গে, একটি সম্পূর্ণ অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ এবং সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দুই দেশের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা তিনি পুনরায় স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন।

 

আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ ও বাধাহীন প্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বৃহত্তর স্বার্থে দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

 

বৈঠকে মিয়ানমারের বর্তমান ক্রমাবনতিশীল অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং এর প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট ভয়াবহ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি মিয়ানমারে অবিলম্বে সব ধরনের সংঘাত ও সহিংসতা বন্ধ করা, দুর্গত মানুষের জন্য নির্বিঘ্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে একটি অর্থবহ ও ফলপ্রসূ সংলাপ শুরু করার উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ অসহায় রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশ সরকার যে নিরলস মানবিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে জাপানের অব্যাহত ও উদার সহযোগিতার তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেন।

 

রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সব পক্ষের সঙ্গে জাপানের মতো প্রভাবশালী দেশের সক্রিয় ও দৃশ্যমান সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, এই জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারের অভ্যন্তরেই নিহিত রয়েছে।

 

বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, পূর্ণ নিরাপত্তায় এবং যথাযথ মানবিক মর্যাদার সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার ওপর তিনি সর্বাধিক জোর দেন।

 

সবশেষে, অত্যন্ত ফলপ্রসূ এই শীর্ষ বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, তা বজায় রাখার পাশাপাশি আজকের এই শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের এক সম্পূর্ণ নতুন ও সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের শুভ সূচনা করবে।

 

তিনি গভীর বিশ্বাস নিয়ে বলেন যে, এই নতুন অধ্যায়টি আরও নিবিড় পারস্পরিক আস্থা, অনেক বেশি বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা, অত্যন্ত শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক সমৃদ্ধি অর্জনের অভিন্ন অঙ্গীকারের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে উঠবে।

 

দুই দেশের পারস্পরিক অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতগুলোকে দ্রুত চিহ্নিত করা, সেগুলোর দৃশ্যমান বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং সহযোগিতার বিদ্যমান সব সুযোগকে অত্যন্ত কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট উদ্যোগে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি স্থায়ী যৌথ কমিশন প্রতিষ্ঠার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

 

একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে আরও বেশি মাত্রায় ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সরাসরি সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। অত্যন্ত গঠনমূলক, খোলামেলা ও আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই বিশ্ব গড়ার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা যে আরও সুদৃঢ় হয়েছে, তা বিশেষভাবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে তার সুবিধাজনক যেকোনো সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য অত্যন্ত আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান।