শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য আগামী এক মাসের মধ্যেই বিশেষ পরীক্ষার আয়োজন করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
শনিবার সকালে রাজধানীর সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সদ্য প্রকাশিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সময় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্তটির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণেও শিক্ষাক্ষেত্রে এ ধরনের সুযোগ প্রদানকে একটি মানবিক এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিচায়ক হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত পরিসংখ্যানগত তথ্যাদি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করে শিক্ষামন্ত্রী জানান যে, এবারের পরীক্ষায় দেশজুড়ে সর্বমোট ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৪১৩ জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
এর মধ্যে শুধুমাত্র একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ জন। অন্যদিকে, দুটি বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে এক এবং দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী সরাসরি উপকৃত হতে যাচ্ছে।
এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত স্থবিরতা থেকে রক্ষা করতেই সরকার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের পুনরায় পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, সরকার কোনোভাবেই চায় না দেশের আগামী প্রজন্মের এই বিপুল সংখ্যক মানবসম্পদ হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত হোক।
এই বিশেষ পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যথেষ্ট সংবেদনশীলতা এবং বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, চাইলে সাত থেকে পনেরো দিনের মধ্যেও এই পরীক্ষাগুলো গ্রহণ করা কাঠামোগতভাবে সম্ভব ছিল।
কিন্তু এত স্বল্প সময়ের নোটিশে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাবে না, যা তাদের পুনরায় ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে। আবার অন্যদিকে, পরীক্ষার সময়সূচি যদি মাত্রাতিরিক্তভাবে পিছিয়ে দেওয়া হয়, তবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন্ন ভর্তি কার্যক্রমে এই শিক্ষার্থীরা চরমভাবে পিছিয়ে পড়বে এবং একটি অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে।
তাই শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রদান এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জাতীয় পঞ্জিকার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এক মাসের বেশি সময় দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
প্রকাশিত ফলাফলের বিষয়ে যাদের মনে অসন্তোষ বা সন্দেহ রয়েছে, তাদের জন্য উত্তরপত্র বা খাতা পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। আগামী ১লা নভেম্বর থেকে ৭ই নভেম্বরের মধ্যে সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের এই পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী অতীতের একটি পরিসংখ্যান টেনে উল্লেখ করেন যে, গত বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর দেশজুড়ে প্রায় ১৩ লাখ উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য জমা পড়েছিল। সেই খাতাগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করার পর দেখা যায়, প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর পূর্ববর্তী গ্রেড পরিবর্তিত হয়েছে।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, সেই পুনর্নিরীক্ষণের ফলে প্রাথমিকভাবে অকৃতকার্য হওয়া প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিল এবং তিন সহস্রাধিক শিক্ষার্থী নতুন করে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করেছিল। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।
উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষকদের দায়িত্বহীনতা এবং অবহেলার বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন থেকে শুরু করে ফলাফল প্রকাশের প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য মন্ত্রণালয় নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
যে সকল পরীক্ষকের মূল্যায়নে মারাত্মক ভুল বা গাফিলতি পরিলক্ষিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত জোরালো ভাষায় জানান, দেশের সরকারপ্রধানও চান যে, প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন তার মেধা ও পরিশ্রম অনুযায়ী সঠিক মূল্যায়ন পায়।
কাউকেই যেন ভুল মূল্যায়নের শিকার হয়ে ভবিষ্যতের পথ থেকে ছিটকে পড়তে না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আগামী দিনগুলোতে একটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও স্বচ্ছ পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য পরীক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এবারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় গড় পাসের হারের নিম্নমুখী প্রবণতা নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। গত বছর যেখানে উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ, সেখানে এ বছর তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেন যে, পাসের হারের এই ধারাবাহিক অবনতি কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয় এবং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি রূঢ় বাস্তব চিত্রকে উন্মোচিত করেছে। শিক্ষার্থীদের শিখন পদ্ধতিতে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ কতটা শিক্ষার্থীবান্ধব এবং পারিবারিক পর্যায়ে অভিভাবকদের সচেতনতার মাত্রা কতটুকু-এই সকল নিয়ামক নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো একযোগে কাজ করবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
নির্দিষ্ট কোন বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি হোঁচট খেয়েছে, গণমাধ্যমকর্মীদের এমন এক প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, এ বছর শুধুমাত্র ইংরেজি বিষয়েই দেশজুড়ে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
পাশাপাশি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হয়েছে ১৩ হাজার ৮৪৯ জন পরীক্ষার্থী। ইংরেজি ভাষার মতো একটি আন্তর্জাতিক ও অত্যাবশ্যকীয় বিষয়ে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর দুর্বলতা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় অশনিসংকেত।
এই ভয়াবহ ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে সারা দেশে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ও আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হাতে নেওয়ার কথা তিনি জানান, যাতে করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত শিক্ষা লাভ করতে পারে।
যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি, অর্থাৎ শূন্য পাসের হারধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গভীরভাবে চিন্তিত। শিক্ষামন্ত্রী জানান, এই সকল ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য নির্ধারণে মন্ত্রণালয় নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে।
প্রয়োজনে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে পার্শ্ববর্তী অপেক্ষাকৃত সফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে একীভূত করার একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তবে তিনি অত্যন্ত মানবিকতার সাথে এই বিষয়টিও নিশ্চিত করেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একীভূত করা হলেও কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর চাকরিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা নেই। সরকারের উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়ন করা, কাউকে বেকারত্বে ঠেলে দেওয়া নয়।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিক এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি তরুণ সমাজকে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি বৃদ্ধি করা এবং নিয়মিত বাড়িতে পড়াশোনার সুস্থ অভ্যাস গড়ে তোলার প্রতি মনোযোগী হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
বর্তমান সময়ের অন্যতম ব্যাধি হিসেবে পরিচিত মুঠোফোন বা প্রযুক্তির প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি এবং মাদকদ্রব্যের ভয়াল থাবা থেকে তরুণ প্রজন্মকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন তিনি। আগামী দিনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তরুণরাই যে জাতির সবচেয়ে বড় ভরসা এবং ভবিষ্যৎ, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান যে, বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে।
উচ্চশিক্ষার স্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মনে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটিও দূর করার চেষ্টা করেন শিক্ষামন্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড শিথিল করা হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান যে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা রয়েছে এবং তারা তাদের নিজ নিজ মান বজায় রেখেই শিক্ষার্থী ভর্তি করবে।
তবে কোনো শিক্ষার্থী যেন উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি সরকার নিশ্চিত করবে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বর্তমানে সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়গুলো মিলিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার আসন শূন্য রয়েছে, যেখানে এবারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।
ফলে আসনসংকট নিয়ে পরীক্ষার্থীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা করেন।
তিনি জানান, পুনর্নিরীক্ষণের মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তনের যে নজির রয়েছে, তা পরীক্ষকদের সীমাহীন দুর্বলতারই অকাট্য প্রমাণ বহন করে। এমনকি বিভিন্ন স্থানে বহুনির্বাচনি প্রশ্নপত্র পরিবর্তন করে দেওয়া এবং সংঘবদ্ধভাবে ফলাফল জালিয়াতির যে অপচেষ্টা করা হয়েছিল, তার বেশ কিছু ঘটনা ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।
পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং খাতা মূল্যায়ন-এই সকল স্তরে যে দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ম বাসা বেঁধেছিল, তা ২০২৬ সালের নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে আমূল সংস্কার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি দুর্বলতা পর্যায়ক্রমে চিহ্নিত করে একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি সংবাদ সম্মেলনের সমাপ্তি টানেন।