মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গুতে​​​​​​​ একদিনে সর্বোচ্চ ১১ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২০৭১ জন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম

ডেঙ্গুতে​​​​​​​ একদিনে সর্বোচ্চ ১১ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২০৭১ জন
ছবি : Collected

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক গভীর ও ক্রমবর্ধমান সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রাণঘাতী এই মশাবাহিত রোগের প্রকোপে পড়ে দেশে গত চব্বিশ ঘণ্টায় আরও এগারো জন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরের একক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর একটি অত্যন্ত দুঃখজনক রেকর্ড।

 

একই সঙ্গে এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন আরও দুই হাজার একাত্তর জন রোগী। মঙ্গলবার, সাতাশে অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের এই উদ্বেগজনক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির সার্বিক ও সর্বশেষ তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের এই ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সংকটকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরবরাহকৃত তথ্যাবলি অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাব ইতোমধ্যে মহামারি তুল্য এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

 

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা চারশো জনে গিয়ে পৌঁছেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, বরং চারশোটি পরিবারের জন্য এক অবর্ণনীয় শোক ও করুণ ট্র্যাজেডি।

 

প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত মানুষের কান্না, স্বজন হারানোর বেদনা এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাটানো দুর্বিষহ মুহূর্তের করুণ আখ্যান। একটি প্রতিরোধযোগ্য মশাবাহিত রোগে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি দেশের সার্বিক মশা নিধন কার্যক্রম, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা কাঠামোর সীমাবদ্ধতাগুলোকেই নতুন করে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে।

 

চলতি বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর মাসিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে এই রোগের ভয়াবহ বিস্তারের একটি অত্যন্ত ভীতিকর চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বছরের প্রথম দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে শুরু করে।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র দুজন করে রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। মে মাসে মারা গিয়েছিলেন মাত্র একজন। কিন্তু জুন মাস থেকে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলাতে শুরু করে, ওই মাসে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় তেরো জনে। জুলাই মাসে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ছত্রিশ জনে এবং আগস্ট মাসে প্রাণ হারান তেতাল্লিশ জন।

 

কিন্তু সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেপ্টেম্বর মাসে একশো আটচল্লিশ জনের মৃত্যুর পর, কেবল অক্টোবর মাসেই এখন পর্যন্ত একশো পঞ্চান্ন জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। পরিসংখ্যানের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মৌসুমের শেষ দিকে এসে ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরনটি আরও বেশি আগ্রাসী এবং প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

 

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে যে, সোমবার সকাল আটটা থেকে পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টায় সারা দেশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে যে দুই হাজার একাত্তর জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন, তাদের নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ আঠাশ হাজার দুইশো সাঁইত্রিশ জনে।

 

এত বিপুলসংখ্যক রোগীর নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক হাসপাতালেই শয্যাসংকটের কারণে মেঝেতে কিংবা বারান্দায় রেখে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

 

তবে এই চরম হতাশার মাঝেও চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক হলো, এ পর্যন্ত মোট এক লাখ একুশ হাজার চারশো বাইশ জন ডেঙ্গু রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেছেন। দেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের এই নিরলস প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে চরম প্রশংসার দাবিদার।

 

ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ প্রকোপ এখন আর কেবল রাজধানী ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ চব্বিশ ঘণ্টার আঞ্চলিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে, যার সংখ্যা আটশো নিরানব্বই জন।

 

কিন্তু ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর পরিস্থিতিও সমানভাবে উদ্বেগজনক। এক দিনে চট্টগ্রাম বিভাগে দুইশো একচল্লিশ জন, খুলনা বিভাগে আড়াইশো জন, বরিশাল বিভাগে দুইশো সতেরো জন এবং রাজশাহী বিভাগে দুইশো উনত্রিশ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

 

এছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে সাতানব্বই জন এবং রংপুর বিভাগে একশো বারো জন নতুন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ভৌগোলিক বিস্তৃতির এই তথ্য প্রমাণ করে যে, এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গুর বিস্তার এখন একটি জাতীয় পর্যায়ের দুর্যোগে পরিণত হয়েছে, যা মোকাবিলায় দেশব্যাপী একটি সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

 

ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ প্রকোপ সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও মানসিক অবস্থার ওপরও এক প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে।

 

বিশেষ করে সংকটাপন্ন ডেঙ্গু রোগীদের রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা দ্রুত কমে যাওয়ার কারণে জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই রক্ত বা প্লাটিলেট সংগ্রহ করতে গিয়ে রোগীর স্বজনদের যে অবর্ণনীয় মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা যেকোনো মানবিক সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

 

অনেক সময় সঠিক সময়ে রক্তদাতাদের না পাওয়ার কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে, যা চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মর্মান্তিক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটছে, তা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য এক অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

 

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে যত্রতত্র বৃষ্টির পানি জমে থাকার প্রবণতা এই মশাবাহিত রোগের প্রকোপকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকারগুলোর নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি সর্বস্তরের নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হওয়া ছাড়া এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণের কোনো সহজ বা জাদুকরী পথ খোলা নেই।

 

বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার জন্য দেশব্যাপী ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।

 

পরিশেষে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি সাধারণ মৌসুমি রোগ নেই, বরং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিনে এগারো জনের মৃত্যু এবং দুই সহস্রাধিক মানুষের আক্রান্ত হওয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট সকল মহলের জন্য একটি অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা।

 

চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর অকল্পনীয় চাপ কমানো এবং অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি রোধ করার জন্য সরকারকে অবিলম্বে আরও কার্যকর, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সুদূরপ্রসারী প্রতিরোধমূলক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে, কারণ সকলের সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়া এই প্রাণঘাতী মশার বিস্তার কোনোভাবেই চিরতরে রোধ করা সম্ভব নয়।