মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি, আরও ৫ জনের মৃত্যু

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম

দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি, আরও ৫ জনের মৃত্যু
ছবি : Collected

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। এডিস মশা বাহিত এই প্রাণঘাতী রোগের বিস্তারে দেশজুড়ে শহর থেকে গ্রাম-সর্বত্রই হাসপাতালগুলোতে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

বিশেষ করে চলতি বছরের শরৎকালীন সময়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।

 

গত চব্বিশ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে আরও ১ হাজার ৮৭২ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ৫ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

 

এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যামাত্র নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এক বিশাল ও অভূতপূর্ব চাপের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মানদণ্ডে বিচার করলে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে এত অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

 

ডেঙ্গু ভাইরাসের বর্তমান ভয়াবহতা অতীতের সকল রেকর্ডকে যেন ম্লান করে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে প্রদত্ত তথ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে মোট ১৯৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

 

মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা জনমনে এক গভীর আতঙ্ক ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। পরিসংখ্যানে মাসভিত্তিক মৃত্যুর যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত ভয়ংকর ও হতাশাজনক। বছরের প্রথম দিক থেকেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকলেও, বর্ষার শেষ এবং শরতের শুরুতে এর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করে।

 

তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২২ দিনেই ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৯৮ জন, যা এখন পর্যন্ত এক মাসে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। এর আগে আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর নির্মম শিকার হয়ে মারা গেছেন ৪৩ জন। জুলাই মাসে এই সংখ্যা ছিল ৩৬ জন।

 

এছাড়া জুন মাসে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং বছরের শুরুতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে যথাক্রমে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ প্রমাণ করে যে, সময় গড়ানোর সাথে সাথে মশার উপদ্রব এবং ভাইরাসের তীব্রতা উভয়ই জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

হাসপাতালে ভর্তির পরিসংখ্যান পরিস্থিতিকে আরও বেশি উদ্বেগজনক করে তুলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, সোমবার সকাল আটটা থেকে শুরু করে পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৮৭২ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

 

এটি এ বছর এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী ভর্তির অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড। এই বিপুল সংখ্যক নতুন রোগীর কারণে চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অভাবনীয় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। চলতি বছর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজার ৪৯৯ জনে।

 

তবে এই অন্ধকার পরিস্থিতির মধ্যেও কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে সুস্থতার হার। চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় গত চব্বিশ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৪৭৭ জন ডেঙ্গু রোগী। আর এ বছর এখন পর্যন্ত চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেছেন মোট ৬০ হাজার ৫৬০ জন মানুষ।

 

ডেঙ্গুর এই প্রকোপ এখন আর কেবল রাজধানী ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেঙ্গু বিস্তারের ভরকেন্দ্র হিসেবে এখনও শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা বিভাগ।

 

এই এক দিনেই ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সর্বোচ্চ ৭৮১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার পরেই সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে খুলনা বিভাগে, যেখানে গত চব্বিশ ঘণ্টায় ৩১৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 

বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেখানে নতুন করে ২৮৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগে এই সংখ্যা ১৯০ জন। উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগে ১৬২ জন এবং রংপুর বিভাগে ৬৭ জন রোগী নতুন করে ডেঙ্গুর শিকার হয়েছেন।

 

এছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে ১০৫ জন এবং সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম, অর্থাৎ ৬ জন রোগী গত চব্বিশ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর এই অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের পেছনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিপাত অনেকাংশে দায়ী।

 

এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও বদ্ধ পানিতে বংশবিস্তার করে থাকে। শহর ও গ্রামগঞ্জের যত্রতত্র পড়ে থাকা প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে জমে থাকা বৃষ্টির পানি এই মশার আদর্শ প্রজননস্থল হিসেবে কাজ করছে।

 

এ বছর বর্ষার মৌসুম দীর্ঘায়িত হওয়া এবং অসময়ে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার প্রজনন চক্র আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মশার উপদ্রব একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় প্রতিদিন শত শত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

 

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, ডেঙ্গুর বর্তমান ধরনটি আগের চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক ও প্রাণঘাতী। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা জ্বর বা শরীর ব্যথার মতো প্রাথমিক উপসর্গগুলোকে সাধারণ ফ্লু বা সর্দি-জ্বর ভেবে মারাত্মক অবহেলা করছেন এবং যখন তাদের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটছে, ঠিক তখনই তারা শেষ মুহূর্তে হাসপাতালের শরণাপন্ন হচ্ছেন।

 

দেরিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণেই মূলত মৃত্যুর হার এতোটা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জোরালোভাবে মনে করছেন। সারা দেশের হাসপাতালগুলোর বর্তমান চিত্র অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও কষ্টদায়ক। শয্যা সংকটের কারণে অনেক হাসপাতালেই রোগীদের মেঝেতে অথবা বারান্দায় রেখে চিকিৎসা প্রদান করতে হচ্ছে।

 

ডাক্তার এবং নার্সরা দিনরাত এক করে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু রোগীর সংখ্যা এতই বেশি যে অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা প্রদান একটি কঠিন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিরায় দেওয়া স্যালাইন এবং রক্তের প্লাটিলেট।

 

রোগীর চাপ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় এই জীবন রক্ষাকারী উপকরণগুলোর চাহিদাও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, কেবল চিকিৎসা দিয়ে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মশা নিধনে একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।

 

আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের এই ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুযায়ী, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সাধারণ মানুষের জনসচেতনতা।

 

নাগরিক সমাজকে নিজ নিজ বাসস্থানের চারপাশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে মশা নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিত ফগিং ও লার্ভিসাইড কার্যক্রম অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে পরিচালনা করতে হবে।

 

ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি সাধারণ রোগ নয়, এটি একটি জাতীয় দুর্যোগের রূপ পরিগ্রহ করেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সকলের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা ছাড়া এডিস মশার এই ভয়াবহ আগ্রাসন রুখে দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

 

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে শরীরে জ্বর দেখা দিলে কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণই পারে ডেঙ্গুর এই দীর্ঘ মৃত্যুমিছিল থামিয়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা করতে।