আগামী পহেলা ডিসেম্বর থেকে এই পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য অপরিহার্য ধাপ হিসেবে অনলাইনে ফরম পূরণ কার্যক্রম আজ বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা আগামী ৯ নভেম্বর পর্যন্ত এই ফরম পূরণের সুযোগ পাবে এবং ফি জমা দেওয়ার সর্বশেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ নভেম্বর। বুধবার, ৪ নভেম্বর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে।
শিক্ষা বোর্ডের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ দেশজুড়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে, কারণ এর ফলে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো যেমন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সর্বদাই বিশেষ জোর দিয়ে থাকে, ঠিক তেমনি একটি দ্বিতীয় সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষা বোর্ড শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে প্রবল মানসিক চাপ ও হতাশা লাঘবের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঠিক কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে একজন শিক্ষার্থী এই সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করবে। নিয়মানুযায়ী, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের চূড়ান্ত পরীক্ষায় যেসব নিয়মিত অথবা অনিয়মিত পরীক্ষার্থী সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, কেবল তারাই এই বিশেষ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে পারবে।
তবে এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই দুটি বিষয়ের হিসাবের মধ্যে কোনোভাবেই চতুর্থ বিষয় বা ঐচ্ছিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। অর্থাৎ, আবশ্যিক বা নৈর্বাচনিক বিষয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ দুটিতে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই এই সুযোগের আওতাভুক্ত হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই নিয়মটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ। কারণ, যেসব শিক্ষার্থী দুইয়ের অধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের মৌলিক প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয় এবং তাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন করে প্রস্তুতি গ্রহণ করাই শ্রেয়।
অন্যদিকে, যারা মাত্র এক বা দুটি বিষয়ে সামান্য নম্বরের জন্য কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পায়নি, তাদের মেধা প্রমাণের জন্য এই সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা একটি অত্যন্ত চমৎকার ও সময়োপযোগী মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
এর ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত তা শুধরে নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং নিজেদের কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রতিযোগিতায় পুনরায় শামিল হতে পারবে।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ড তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রমকে আরও বেশি গতিশীল, স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার লক্ষ্যে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ফরম পূরণ প্রক্রিয়া চালু করেছে। পরিপূরক বা সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার ফরম পূরণের ক্ষেত্রেও পরীক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও নির্ধারিত অনলাইন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নিজস্ব ওয়েবসাইট ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অনলাইনে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রদর্শন করবে। এরপর সেই সম্ভাব্য তালিকা থেকে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীর দেওয়া সকল ব্যক্তিগত ও শিক্ষাগত তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করতে হবে।
তথ্য যাচাইয়ের এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সামান্য ভুলত্রুটিও শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত হওয়ার পর নির্বাচিত পরীক্ষার্থীদের তালিকাটি মুদ্রণ করে বের করতে হবে।
এই মুদ্রিত তালিকায় কোনো ধরনের জালিয়াতি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল এড়ানোর জন্য পরীক্ষার্থী নিজে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই সকল প্রাথমিক ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর চূড়ান্ত পর্যায়ে অনলাইনে ‘ইলেকট্রনিক ফরম পূরণ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এই সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তর প্রমাণ করে যে, শিক্ষা বোর্ড এখন অনেক বেশি প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম এবং যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক বিলম্ব এড়াতে তারা বদ্ধপরিকর।
যেকোনো জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা এবং নির্ধারিত সময়সূচির কঠোর অনুসরণ একটি অত্যন্ত অপরিহার্য বিষয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড তাদের বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, অনলাইনে সম্ভাব্য তালিকা প্রদর্শন এবং ফরম পূরণের কাজ ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে আগামী ৯ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে।
এই নির্দিষ্ট সময়সীমার পর কোনো অবস্থাতেই নতুন করে কোনো আবেদন গ্রহণ করা হবে না। এছাড়া, পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সকল পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর কোনো অবস্থাতেই পরীক্ষার ফি বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কর্তৃপক্ষের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এই ধরনের কঠোর সময়সীমা অত্যন্ত যৌক্তিক। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত শেষ মুহূর্তের প্রযুক্তিগত জটিলতা, ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যা বা সার্ভারের ধীরগতির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য অবিলম্বে নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা এবং নির্ধারিত সময়ের যথেষ্ট আগেই ফরম পূরণ ও আনুষঙ্গিক ফি জমা দেওয়ার সম্পূর্ণ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা।
এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পরীক্ষার ফি জমাদান পদ্ধতি। শিক্ষা বোর্ড শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার জন্য তত্ত্বীয় প্রতি পত্র বা বিষয়ের জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১২৫ টাকা এবং ব্যবহারিক প্রতি পত্র বা বিষয়ের জন্য এই ফি ধরা হয়েছে ২৫ টাকা।
এর পাশাপাশি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কেন্দ্র ফি হিসেবে ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির ওপর শিক্ষা বোর্ড জোর দিয়েছে তা হলো, ফি জমা দেওয়ার মাধ্যম।
আধুনিক ও নিরাপদ লেনদেনের স্বার্থে পরীক্ষার যাবতীয় ফি শিক্ষা বোর্ডের সচিবের অনুকূলে সোনালী ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে শুধুমাত্র ‘সোনালী সেবা’ নামের বিশেষায়িত মাধ্যমেই জমা দিতে হবে।
এখানে অত্যন্ত কঠোরভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে যে, কোনো অবস্থাতেই নগদ অর্থ, পে-অর্ডার, পোস্টাল অর্ডার, মানি অর্ডার কিংবা ট্রেজারি চালানের মতো পুরোনো পদ্ধতির মাধ্যমে এই ফি জমা দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।
শুধুমাত্র নির্ধারিত ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে ফি গ্রহণের এই সিদ্ধান্তটি মূলত আর্থিক লেনদেনে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এবং শিক্ষার্থীদের অর্থ নিরাপদে সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই গ্রহণ করা হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এইচএসসি সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য এক নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে। এটি শুধু একটি পরীক্ষাই নয়, বরং এটি সেইসব তরুণদের জন্য নিজেদের প্রমাণ করার একটি দ্বিতীয় সুযোগ, যারা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে বা সামান্য ভুলের জন্য তাদের জীবনের প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষায় হোঁচট খেয়েছিল।
আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই পরীক্ষার জন্য এখন থেকেই শিক্ষার্থীদের উচিত নিজেদের মানসিক ও একাডেমিকভাবে প্রস্তুত করা। আবেদন প্রক্রিয়ার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত তাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি সর্বোচ্চ সহযোগিতাপূর্ণ ও সংবেদনশীল আচরণ করা, যাতে কোনো প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা বা যোগাযোগের অভাবের কারণে একজন যোগ্য শিক্ষার্থীও তার এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।
শিক্ষা বোর্ডের এই সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সঠিক দিকনির্দেশনা, নিয়মানুবর্তিতা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হবে এবং অগণিত শিক্ষার্থীর জীবনে উচ্চশিক্ষার বন্ধ দরজাগুলো পুনরায় উন্মুক্ত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সকল মহল গভীরভাবে প্রত্যাশা করছে।