সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬
২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫২ বছর মাত্র এক টাকায় শিক্ষাদান, রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত গাইবান্ধার লুৎফুর রহমান

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম

৫২ বছর মাত্র এক টাকায় শিক্ষাদান, রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত গাইবান্ধার লুৎফুর রহমান
ছবি: সংগৃহীত

সমাজে এমন কিছু নিভৃতচারী মানুষ থাকেন, যাদের সমগ্র জীবন উৎসর্গিত হয় কেবল অন্যের মঙ্গলের জন্য। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি, অর্থবিত্ত বা বিশাল অট্টালিকার মোহ তাদের থাকে না, বরং তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে সমাজের প্রতিটি স্তরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া।

 

ঠিক এমনই এক অনন্য ও অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাইবান্ধার একনিষ্ঠ শিক্ষাব্রতী লুৎফুর রহমান। দীর্ঘ বায়ান্ন বছর ধরে যিনি সমাজের অত্যন্ত অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে নামমাত্র এক টাকার বিনিময়ে শিক্ষার আলো বিতরণ করে আসছেন।

 

তার এই অসামান্য, নিরলস ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করেছে। সোমবার, ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মহান শিক্ষকের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।

 

এটি কেবল একজন সাধারণ ব্যক্তির অর্জন নয়, বরং এটি সারা দেশের অগণিত নিঃস্বার্থ শিক্ষকের প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের গভীর শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মাত্র কয়েক বছর পর, যখন দেশ নানা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই ১৯৭৪ সাল থেকে লুৎফুর রহমান তার এই মহান শিক্ষাদানের ব্রত শুরু করেন।

 

গাইবান্ধার মতো একটি প্রান্তিক অঞ্চলে, যেখানে নিদারুণ দারিদ্র্য ও অভাবের কারণে অসংখ্য শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে শিশুশ্রমের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, সেখানে তিনি এক আশার আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হন।

 

অর্থের অভাবে যেসব শিশুর পড়ালেখা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তাদের কাছে শিক্ষার অধিকার পৌঁছে দেওয়াই হয়ে ওঠে তার জীবনের একমাত্র আরাধ্য। নিজের ঐকান্তিক উদ্যোগে ও একান্ত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা এই শিক্ষাসেবা সময়ের পরিক্রমায় তাকে গাইবান্ধার গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশে ‘এক টাকার শিক্ষক’ হিসেবে এক অনন্য ও সর্বজনীন পরিচিতি এনে দেয়।

 

তিনি জীবনে কোনো নির্দিষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি ঠিকই, কিন্তু তার এই খোলা আকাশের নিচের পাঠশালায় শিক্ষাগ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

 

মাত্র এক টাকার বিনিময়ে শিক্ষাদানের এই অভিনব উদ্যোগ কেবল স্বল্প খরচে পড়ালেখার সুযোগ সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সমাজে নিজেদের সম্মানজনক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যা আধুনিক সমাজব্যবস্থায় এক অভাবনীয়, বিরল ও ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

 

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের তাৎপর্যপূর্ণ এই দিনে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে লুৎফুর রহমানের এই দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাসেবাকে ‘বিশেষ শ্রেণিতে’ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল উদ্যোগে আয়োজিত এই মহতী অনুষ্ঠানে সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রত্যেক গুণী শিক্ষককে দুই লাখ টাকার আর্থিক অনুদান, একটি সুদৃশ্য সম্মাননা স্মারক এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপত্র প্রদান করা হয়।

 

যখন লুৎফুর রহমান মঞ্চে আরোহণ করেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে জীবনের এই পরম আরাধ্য সম্মাননা গ্রহণ করেন, তখন পুরো মিলনায়তনে এক গভীর আবেগঘন ও শ্রদ্ধাবনত পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

 

আজীবন নিভৃতে কাজ করে যাওয়া একজন সাধারণ মানুষের এই অসাধারণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নিঃস্বার্থ ও মহৎ কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন রাষ্ট্র কোনো না কোনোভাবে ঠিকই করে থাকে।

 

এই সম্মাননা কেবল তার ব্যক্তিগত ত্যাগকে সম্মানিত করেনি, বরং দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এমন আরও অনেক মানবহিতৈষী ও সমাজসংস্কারক কর্মীকে নতুন করে মানবকল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়তে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।

 

এই বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা প্রদানের জন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মহাবিদ্যালয়, মাদরাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাধারণ ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান এবং প্রকৌশল শিক্ষাসহ নানা স্তরের মোট ১০২ জন অসামান্য গুণী শিক্ষককে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করা হয়।

 

এই দীর্ঘ ও মর্যাদাপূর্ণ তালিকার মধ্যে লুৎফুর রহমানের পাশাপাশি আরও কয়েকজন নিভৃতচারী ও নিঃস্বার্থ শিক্ষাব্রতীকে বিশেষ শ্রেণিতে সম্মানিত করা হয়েছে, যা এই অনুষ্ঠানটিকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারে অসামান্য ভূমিকা রাখা ‘রমনী কান্ত পাঠশালা’-এর স্বাপ্নিক প্রতিষ্ঠাতা রমনী কান্ত বেপারী।

 

এছাড়া সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পারিপার্শ্বিক অবহেলা থেকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে এবং তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে নিরলস কাজ করে যাওয়া ‘প্রয়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশন’-এর নিবেদিতপ্রাণ সহকারী শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হোসেন খানকেও এই বিশেষ শ্রেণিতে সম্মাননা প্রদান করা হয়।

 

এই গুণীজনদের জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে সরকার মূলত একটি বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও চরম মানবিক সমাজ গঠনের সুনির্দিষ্ট বার্তাই দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছে। রাষ্ট্রীয় সম্মাননার জন্য এই গুণী শিক্ষকদের চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও কাঠামোগতভাবে সুদৃঢ়।

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পৃথক পৃথক বিচারক প্যানেল ও অত্যন্ত দক্ষ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়।

 

এই অনুসন্ধান কমিটিগুলো দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে যোগ্য, নিবেদিতপ্রাণ ও আদর্শ শিক্ষকদের অতীত ইতিহাস, তাদের কর্মময় জীবন এবং সমাজে তাদের সামগ্রিক অবদানের বিস্তর তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংগ্রহ করে।

 

এরপর দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়নের পর চূড়ান্তভাবে এই ১০২ জন শ্রেষ্ঠ শিক্ষককে সম্মাননার জন্য মনোনীত করা হয়, যাতে করে শিক্ষার কোনো শাখাই রাষ্ট্রের এই মহতী স্বীকৃতি প্রদান প্রক্রিয়া থেকে বাদ না পড়ে।

 

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এই মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তার প্রাঞ্জল ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপরেখা, কাঠামোগত সংস্কার এবং শিক্ষকদের প্রতি বর্তমান সরকারের অবিচল দায়বদ্ধতার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

 

অনুষ্ঠানটির মঞ্চে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষকদের অপরিমেয় ত্যাগ ও মহান আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সম্মানিত সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া।

 

এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।

 

আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ ও সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের এই সরব উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, একটি আধুনিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষকদের অপরিহার্য ভূমিকাকে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং তাদের কল্যাণে সরকার বদ্ধপরিকর।

 

পরিশেষে বলা যায়, গাইবান্ধার লুৎফুর রহমানের মতো মহামানবেরা যুগে যুগে জন্ম নেন সমাজকে কেবল নিঃস্বার্থভাবে দেওয়ার জন্যই। পার্থিব কোনো প্রাপ্তি বা জাগতিক খ্যাতির বিন্দুমাত্র আশা না রেখেই তিনি তার জীবনের সুদীর্ঘ বায়ান্নটি বছর বিলিয়ে দিয়েছেন অগণিত সুবিধাবঞ্চিত শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার পবিত্র কাজে।

 

তার এই ‘এক টাকার পাঠশালা’ হয়তো কোনো বিলাসবহুল বহুতল ভবনে গড়ে ওঠেনি, কিন্তু সেখান থেকে যে অকৃত্রিম শিক্ষার আলোর বিচ্ছুরণ ঘটেছে, তা একটি পুরো সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোকিত করতে সক্ষম হয়েছে।

 

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাকে প্রদত্ত এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা আধুনিক প্রজন্মের তরুণদের কাছে একটি অত্যন্ত জোরালো বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, একাগ্রতা, সততা, নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত অংশের জন্যও অবিস্মরণীয় ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

 

লুৎফুর রহমানের এই অসামান্য জীবনকাহিনি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে চিরকাল আলো ছড়িয়ে যাবে এবং আগামী দিনের শিক্ষকদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।