বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫১তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, নিয়োগ পাচ্ছেন পাঁচ হাজার চিকিৎসক

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

৫১তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, নিয়োগ পাচ্ছেন পাঁচ হাজার চিকিৎসক
ছবি : Collected

দেশের ভঙ্গুর জনস্বাস্থ্য কাঠামোর পুনর্গঠন, তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত চিকিৎসক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও বহুল প্রতীক্ষিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার।

 

সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে নতুন উদ্যমে গতিশীল ও কার্যকর করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে ৫১তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা-২০২৬ এর আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)।

 

বিশেষ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে একযোগে পাঁচ হাজার যোগ্য ও দক্ষ নবীন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিকিৎসা খাতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বড় ও উল্লেখযোগ্য নিয়োগ উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

 

দীর্ঘ টানাপোড়েন ও চিকিৎসাসেবার সংকটকালে সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রকাশিত বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান বাস্তব চাহিদা ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্য পদের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এই পাঁচ হাজার চিকিৎসকের পদবিন্যাস চূড়ান্ত করা হয়েছে।

 

এর মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করার জন্য চার হাজার সাতশত জন সহকারী সার্জন নিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি মুখ ও দাঁতের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবাকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করতে তিনশত জন সহকারী ডেন্টাল সার্জন নিয়োগের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার, চব্বিশে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন তাদের নিজস্ব সচিবালয় থেকে এই আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিটি গণমাধ্যম ও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে প্রকাশ করে। তবে কমিশন বিজ্ঞপ্তিতে সুস্পষ্টভাবে একটি শর্ত উল্লেখ করেছে যে, প্রশাসনিক সংস্কার, নতুন পদ সৃষ্টি, কোনো বিদ্যমান পদের বিলুপ্তি কিংবা পদোন্নতিজনিত কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে চূড়ান্ত নিয়োগকালে এই শূন্য পদের সংখ্যায় কিছুটা হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটতে পারে।

 

এই বৃহৎ নিয়োগযজ্ঞে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহী যোগ্য প্রার্থীদের আবেদন প্রক্রিয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট সময়সূচি ও দিকনির্দেশনা বেঁধে দিয়েছে পিএসসি। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১ অক্টোবর সকাল দশটা থেকে সরকারি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের নির্ধারিত ওয়েব পোর্টাল এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অনলাইন পদ্ধতিতে আবেদনপত্র গ্রহণ কার্যক্রম শুরু হবে।

 

আবেদন প্রক্রিয়াটি কোনো ধরনের বিরতি ছাড়া আগামী ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত সার্বক্ষণিকভাবে চালু থাকবে। আবেদন ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সামাজিক সমতা ও নাগরিক সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সাধারণ ও অন্যান্য সব প্রার্থীর জন্য আবেদন ফি ধরা হয়েছে দুইশত টাকা।

 

অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার অংশ হিসেবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীভুক্ত প্রার্থী, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই আবেদন ফি নামমাত্র পঞ্চাশ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে টেলিটকের আনুষঙ্গিক ভ্যাট এবং অনলাইন ডেটা যাচাইকরণ বাবদ অতিরিক্ত পাঁচ টাকা সেবা মাশুল যুক্ত হবে।

 

নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে যেসব প্রার্থী অনলাইনে সফলভাবে নিবন্ধন সম্পন্ন করে ইউজার আইডি প্রাপ্ত হবেন, তারা পরবর্তী বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো সময় টেলিটক প্রিপেইড সংযোগের মাধ্যমে ফি পরিশোধের সুযোগ পাবেন।

 

আবেদনের বয়সসীমা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তাবলির ক্ষেত্রেও চিকিৎসকদের পেশাগত প্রস্তুতির বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর তারিখে যেসব আগ্রহী প্রার্থীর বয়স সর্বনিম্ন একুশ বছর এবং সর্বোচ্চ বত্রিশ বছরের মধ্যে থাকবে, কেবল তারাই এই বিশেষ বিসিএসে অংশ নেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

 

চিকিৎসকদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবন ও ইন্টার্নশিপের বাস্তবতার কথা স্মরণে রেখেই এই বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে যেসব তরুণ চিকিৎসক ইতিমধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন, তাদের জন্যও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

 

তবে এ ক্ষেত্রে একটি কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে, ওই প্রার্থীদের স্নাতক বা পেশাগত ডিগ্রির সকল লিখিত পরীক্ষা অবশ্যই ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবরের মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হতে হবে।

 

কোনো প্রার্থী যদি দেশি বা বিদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করে থাকেন, তবে মৌখিক পরীক্ষার সময় তাদেরকে সমমানের সনদপত্র এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বা বিএমডিসির হালনাগাদ স্থায়ী বা সাময়িক নিবন্ধন সংক্রান্ত সকল মূল কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন ও জমা দিতে হবে।

 

অন্যথায় তাদের প্রার্থিতা সরাসরি বাতিল বলে গণ্য করা হবে। এ ছাড়া বর্তমানে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে অবশ্যই তাদের বর্তমান নিয়োগকারী যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে আবেদন করতে হবে।

 

প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন একটি সুবিন্যস্ত তিনশত নম্বরের সমন্বিত মূল্যায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করেছে। এই মূল্যায়নের মধ্যে দুইশত নম্বরের প্রিলিমিনারি প্রকৃতির লিখিত পরীক্ষা এবং একশত নম্বরের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার বা মৌখিক পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। লিখিত পরীক্ষাটি সম্পূর্ণভাবে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন বা এমসিকিউ পদ্ধতিতে গ্রহণ করা হবে।

 

একজন চিকিৎসকের সাধারণ জ্ঞান, ভাষাগত দক্ষতা, পেশাগত গভীরতা ও মানবিক মূল্যবোধ যাচাইয়ের জন্য প্রশ্নপত্রের কাঠামোকে অত্যন্ত সুষমভাবে সাজানো হয়েছে। লিখিত পরীক্ষার নির্ধারিত দুইশত নম্বরের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কুড়ি নম্বর, ইংরেজি ভাষায় কুড়ি নম্বর, বাংলাদেশ বিষয়াবলিতে কুড়ি নম্বর এবং সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে কুড়ি নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

 

এ ছাড়া প্রার্থীর মনস্তাত্ত্বিক তীক্ষ্ণতা এবং সমস্যা সমাধানের যৌক্তিক সক্ষমতা যাচাই করতে মানসিক দক্ষতায় দশ নম্বর এবং গাণিতিক যুক্তিতে দশ নম্বর নির্ধারিত রয়েছে। বাকি একশত নম্বর সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংশ্লিষ্ট ক্যাডার বা পদের মূল চিকিৎসা বিষয়ের ওপর নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে একজন প্রার্থীর ক্লিনিক্যাল জ্ঞান ও পেশাগত সক্ষমতা যথাযথভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয়।

 

পরীক্ষায় আন্দাজে উত্তর দেওয়ার প্রবণতা রোধ করতে এবং মেধার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নেগেটিভ মার্কিংয়ের বিধান বহাল রাখা হয়েছে; যার ফলে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য প্রাপ্ত মোট নম্বর থেকে শূন্য দশমিক পঞ্চাশ নম্বর বা আধা নম্বর কেটে নেওয়া হবে।

 

কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চলমান চিকিৎসক ঘাটতি দ্রুত দূর করার তীব্র তাগিদ থাকায় তারা কোনো ধরনের বিলম্ব না করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করতে চায়।

 

সেই ধারাবাহিকতায় আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যেই এই বিশেষ বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বিশালাকার লিখিত পরীক্ষাটি মূলত রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তায় অনুষ্ঠিত হবে।

 

পরীক্ষার সার্বিক স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে পিএসসি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার কোনো স্তরে কোনো ধরনের তদবির বা অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালানো হলে তা সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর সরাসরি অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

এ ছাড়া আবেদনপত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো অসত্য তথ্য প্রদান করা, জাল বা ভুয়া একাডেমিক ও পেশাগত সনদ দাখিল করা কিংবা পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ বা যেকোনো ধরনের নিষিদ্ধ ডিজিটাল ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে অসদুপায় অবলম্বনের সামান্যতম চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রার্থিতা বাতিল করা হবে।

 

শুধু প্রার্থিতা বাতিলই নয়, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে এবং ভবিষ্যতে সরকারি কর্ম কমিশনের অধীন সকল সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে আজীবনের জন্য অযোগ্য বা কালোতালিকাভুক্ত ঘোষণা করা হতে পারে।

 

সামগ্রিকভাবে স্বচ্ছতা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং মেধার ভিত্তিতে এই পাঁচ হাজার নবীন চিকিৎসকের সরকারি চাকরিতে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে দেশের জাতীয় স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সকল মহল গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে।