প্রতিদিনের এই নিরন্তর ছুটে চলার পথে মানুষের মনে যে অহেতুক দুশ্চিন্তা ও মানসিক ক্লান্তি বাসা বাঁধছে, তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি, কাজের মনোযোগ এবং সার্বিক জীবনযাত্রার মানের ওপর।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল ধরেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সতর্ক করে আসছেন যে, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ কেবল মনেরই নয়, বরং শরীরেরও ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে এবং নানাবিধ জটিল রোগের সূত্রপাত ঘটায়।
দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে কিংবা কোনো উৎসব বা গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের আগে নিজেকে সম্পূর্ণ সতেজ, প্রফুল্ল এবং দুশ্চিন্তামুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক এই গভীর অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে সব সময় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যবস্থা বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা থেরাপির প্রয়োজন হয় না।
বরং প্রতিদিন সকাল কিংবা সন্ধ্যায় নিজের জন্য সামান্য সময় বের করে মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড থেকে শুরু করে কয়েক মিনিটের কিছু সুনির্দিষ্ট চর্চা মানুষের মনকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি প্রদানে জাদুর মতো কাজ করতে পারে। এই সহজলভ্য ও প্রমাণিত উপায়গুলো যেকোনো বয়সের মানুষ অত্যন্ত সহজেই নিজেদের প্রাত্যহিক রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।
মানসিক এই প্রচণ্ড চাপ মোকাবিলার প্রথম এবং অন্যতম প্রধান ধাপ হলো শারীরিক ও মানসিক স্থিরতা আনয়ন করা। প্রাচ্য দর্শনে এবং আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে যোগব্যায়ামের একটি বিশেষ আসন হিসেবে 'সিদ্ধাসন' অত্যন্ত পরিচিত ও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত একটি পদ্ধতি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিয়মিত এই অভ্যাসের মাধ্যমে মানব মন ও শরীরের মধ্যে এক গভীর, অবিচ্ছেদ্য এবং প্রশান্তিদায়ক সংযোগ স্থাপিত হয়। এই আসনটি করার জন্য প্রথমে একটি সমতল স্থানে বা একটি আরামদায়ক ম্যাটের ওপর মেরুদণ্ড একেবারে সোজা ও টানটান করে বসতে হয়।
এরপর ধীরে ধীরে এবং গভীরভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়, যাতে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের প্রবাহ নিশ্চিত হয়। বসার ক্ষেত্রে প্রথমে বাঁ পা ভাঁজ করে ডান পায়ের ওপর এবং ঠিক একইভাবে ডান পা ভাঁজ করে বাঁ পায়ের ওপর স্থাপন করতে হয়।
এই নির্দিষ্ট শারীরিক মুদ্রায় বসার পর দুই হাত হাঁটুর ওপর আলতো করে রেখে 'জ্ঞান মুদ্রা' তৈরি করতে হয়। এই মুদ্রায় তর্জনী এবং বৃদ্ধাঙ্গুলির অগ্রভাগ একে অপরের সাথে আলতোভাবে স্পর্শ করে রাখতে হয় এবং হাতের বাকি তিনটি আঙুল সম্পূর্ণ সোজা ও শিথিল থাকে।
একটি শান্ত পরিবেশে এই অবস্থায় কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকলে তা সারাদিনের বিক্ষিপ্ত মনকে স্থির করতে এবং অন্তরের গভীর অস্থিরতা দূর করতে অভাবনীয় সাহায্য করে। এটি চিন্তার জট খুলতেও অত্যন্ত সহায়ক।
শারীরিক স্থিরতা অর্জনের পর মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর হরমোন বা গ্রন্থিরস নিয়ন্ত্রণে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম অত্যন্ত কার্যকরী ও জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে শ্বাস নিয়ন্ত্রণের এমন একটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুপরীক্ষিত পদ্ধতিকে 'বক্স ব্রিদিং' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যা বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বেও মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার একটি অংশ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
এই প্রক্রিয়ার শুরুতে ফুসফুস থেকে ধীরে ধীরে সমস্ত বাতাস বের করে দিয়ে শরীরকে সম্পূর্ণ স্থির ও চিন্তামুক্ত করতে হয়। এরপর ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক দশ সেকেন্ড সময় নিয়ে বুক ভরে গভীরভাবে চারপাশের সতেজ বাতাস শ্বাস হিসেবে টেনে নিতে হয়।
শ্বাস ভেতরে নেওয়ার পর তা সঙ্গে সঙ্গে বের না করে দিয়ে, মনে মনে অত্যন্ত ধীরগতিতে পাঁচ পর্যন্ত গণনা করা পর্যন্ত ফুসফুসে ধরে রাখতে হয়। পরবর্তীতে আবার ঠিক দশ সেকেন্ড সময় ব্যয় করে অত্যন্ত ধীরগতিতে ও শান্তভাবে সেই শ্বাস বাইরে ছেড়ে দিতে হয়।
মনস্তত্ত্ববিদ ও চিকিৎসকরা জানান, মানবদেহের সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে এবং তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো দুশ্চিন্তা বা হঠাৎ তৈরি হওয়া মানসিক আতঙ্ক প্রশমিত করতে এই শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশলটি একটি প্রমাণিত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
বক্স ব্রিদিংয়ের পাশাপাশি শ্বাসের চর্চাকে শরীরের আরও গভীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য 'ভস্ত্রিকা প্রাণায়াম' নামক আরেকটি সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির কথা বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন।
এই শ্বাসযন্ত্রের ব্যায়ামটি করার জন্য মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ সোজা রেখে একটি আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসে গভীরভাবে শ্বাস গ্রহণ করতে হয় এবং তা কিছুক্ষণ ফুসফুসে আটকে রাখার পর ধীরে ধীরে বাইরে ছেড়ে দিতে হয়। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগের ক্ষেত্রে সময়ের নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখা।
অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যতটুকু সময় নিয়ে শ্বাস ভেতরে গ্রহণ করবেন, ঠিক ততটুকু সময় নিয়েই তাকে সম্পূর্ণ শ্বাস বাইরে ত্যাগ করতে হবে। প্রতিদিন সকালে বা কাজের ফাঁকে মাত্র তিন থেকে ছয় মিনিট এই নির্দিষ্ট ব্যায়ামটি নিরবচ্ছিন্নভাবে অনুশীলন করলে তা মানুষের গভীর মানসিক অবসাদ ও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি দূর করতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, যেসব মানুষের হাঁপানি বা সাইনাসের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও বিরক্তিকর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এই ব্যায়ামটি কেবল মানসিক প্রশান্তিই নিশ্চিত করে না, বরং শ্বাসযন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে শারীরিক সুস্থতা আনয়নেও ব্যাপক মাত্রায় উপকার বয়ে আনে।
মানসিক প্রশান্তি আনয়ন এবং হৃত শারীরিক প্রাণশক্তি পুনরায় পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে মানবদেহের স্নায়ুকেন্দ্রগুলোর সাথে আঙুলের বিশেষ অবস্থান বা মুদ্রার বৈজ্ঞানিক প্রভাবও অনস্বীকার্য। এর মধ্যে 'প্রাণ মুদ্রা' নামক একটি বিশেষ স্নায়বিক পদ্ধতি আধুনিক যুগের কর্মব্যস্ত ও ক্লান্ত মানুষদের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি সমাধান হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
এই চর্চার জন্য প্রথমেই শরীরকে সম্পূর্ণ সোজা ও শিথিল রেখে বসে শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক গতি বজায় রাখতে হয়। এরপর দুই হাতের কনিষ্ঠা অর্থাৎ সবচেয়ে ছোট আঙুল এবং তার পাশের অনামিকা আঙুলকে একসাথে যুক্ত করে বৃদ্ধাঙ্গুলির শীর্ষভাগের সাথে আলতো করে স্পর্শ করতে হয়, যখন হাতের বাকি দুটি আঙুল সম্পূর্ণ সোজা বা টানটান অবস্থায় সামনের দিকে প্রসারিত থাকে।
হাত দুটিকে দুই হাঁটুর ওপর আলতো করে রেখে, চোখ বন্ধ করে যদি অন্তত দশ মিনিট এই ধ্যানমগ্ন অবস্থায় স্থির হয়ে বসা যায়, তবে তা শরীরের স্নায়ুতন্ত্রকে গভীরভাবে শান্ত করে তোলে। সারা দিনের জমে থাকা শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর করে শরীরে নতুন করে জীবনীশক্তি বা প্রাণশক্তির সঞ্চার করতে এই প্রাণ মুদ্রা একটি অত্যন্ত কার্যকরী, সহজলভ্য এবং পরীক্ষিত উপায়।
এটি মস্তিষ্ককে পুনরায় সতেজ করে কর্মোদ্দীপনা ফিরিয়ে আনে। আধুনিক কর্মজীবনে দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে একটানা কাজ করা বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের পর্দার সামনে ঝুঁকে থাকার কারণে পেশাজীবীদের শরীরের বিভিন্ন পেশিতে এক ধরনের কাঠিন্য বা আড়ষ্টতা তৈরি হয়, যা পরোক্ষভাবে মানুষের মানসিক চাপ ও বিরক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি করে।
শরীরের এই দীর্ঘস্থায়ী জড়তা কাটাতে এবং মনকে দ্রুত সতেজ করতে 'চেস্ট ওপেনার স্ট্রেচ' বা বুক প্রসারিত করার ব্যায়ামটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ একটি উপায়। এটি করার জন্য বিশেষ কোনো পোশাক বা প্রস্তুতির একেবারেই প্রয়োজন নেই; কর্মক্ষেত্রের নিজের চেয়ারে সোজা হয়ে বসে কাঁধ দুটি সমান্তরাল রেখে যেকোনো সময়েই এই ব্যায়ামটি করা যায়।
প্রথমে দুই হাত পিঠের পেছনে নিয়ে গিয়ে একটি হাত দিয়ে অপর হাতটিকে শক্তভাবে ধারণ করতে হয়। এরপর মেরুদণ্ড ও পিঠ সম্পূর্ণ টানটান রেখে হাত দুটিকে যতটা সম্ভব পেছনের দিকে প্রসারিত করার চেষ্টা করতে হয়। বুক প্রসারিত থাকা এই অবস্থায় অন্তত বিশ থেকে ত্রিশ সেকেন্ড স্থির অবস্থান করে গভীরভাবে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে ও ছাড়তে হয়।
এই সাধারণ অথচ অত্যন্ত কার্যকর পেশি প্রসারণের ফলে শরীরের পেশির জড়তা খুব দ্রুত কেটে যায়, দেহে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়ার কারণে মুহূর্তের মধ্যেই মন সতেজ, প্রফুল্ল ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, আধুনিক যুগের যান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক জীবনে মানসিক চাপকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা হয়তো কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে দৈনন্দিন রুটিনে সামান্য কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনে এই চাপকে সফলভাবে মোকাবিলা করা অবশ্যই সম্ভব।
সুস্থ, সুন্দর ও দুশ্চিন্তামুক্ত একটি দীর্ঘ জীবনের জন্য এই পাঁচটি সহজ, অর্থবহ এবং অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত উপায় প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা এবং নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি কিছুটা আন্তরিক যত্নশীল হওয়া।
কর্মব্যস্ততার ফাঁকে প্রতিদিন নিয়ম করে মাত্র কয়েকটি মিনিট নিজের জন্য ব্যয় করলে তা একদিকে যেমন পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে সাহায্য করবে, অন্যদিকে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনেও অনাবিল প্রশান্তি ও ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।