বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাসিকের সময় মাথা ঘোরার শারীরিক কারণ ও চিকিৎসকদের পরামর্শে সহজ প্রতিকার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

মাসিকের সময় মাথা ঘোরার শারীরিক কারণ ও চিকিৎসকদের পরামর্শে সহজ প্রতিকার
ছবি : Collected

মাসিক বা পিরিয়ডের দিনগুলোতে শারীরিকভাবে অস্বস্তি ও দুর্বলতা অনুভব করা অনেক নারীর জন্যই একটি পরিচিত অভিজ্ঞতা। এই বিশেষ সময়ে পেট ব্যথা, শরীরে ক্লান্তি বা মেজাজের পরিবর্তনের পাশাপাশি অনেক নারীই হঠাৎ মাথা ঘোরা বা মাথা হালকা হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন।

 

আপাতদৃষ্টিতে এটিকে সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা বলে মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর পেছনে রয়েছে হরমোনের তীব্র ওঠানামা, রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মতো একাধিক শারীরিক প্রক্রিয়া।

 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মাসিকের সময় নারীর শরীরে যে সার্বিক পরিবর্তন ঘটে, তা অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যকে সাময়িকভাবে বিঘ্নিত করতে পারে। সঠিক সচেতনতা, খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে এই অস্বস্তিকর শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

 

মাসিকের সময় মাথা ঘোরার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং এর ফলে সৃষ্টি হওয়া আয়রনের ঘাটতি বা অ্যানিমিয়া। মাসিকের দিনে শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে যাওয়ার সময় রক্তে থাকা লোহিত রক্তকণিকা ও হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ হ্রাস পায়।

 

হিমোগ্লোবিনের প্রধান কাজ হলো ফুসফুস থেকে অক্সিজেন শরীরের প্রতিটি কোষে এবং বিশেষ করে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেওয়া। যখন অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়, তখন মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয়।

 

এর সরাসরি প্রভাব হিসেবে নারী তীব্র মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম ভাব এবং চরম দুর্বলতা অনুভব করেন। বিশেষ করে যাদের মাসিকের রক্তপাত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই রক্তশূন্যতাজনিত মাথা ঘোরার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

 

শরীরে পানির অপর্যাপ্ততা বা ডিহাইড্রেশনও মাথা ঘোরার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাসিকের সময় অনেক নারীই স্বাভাবিকের চেয়ে কম তরল বা পানি পান করে থাকেন। এর ওপর যদি মাসিকের আনুষঙ্গিক লক্ষণ হিসেবে বমি বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা যুক্ত হয়, তবে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় উপাদান বেরিয়ে যায়।

 

শরীরে তরলের পরিমাণ কমে গেলে রক্তের মোট আয়তন হ্রাস পায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হাইপোভোলেমিয়া বলা হয়। রক্তের আয়তন কমে গেলে রক্তচাপ হঠাৎ নিচে নেমে যায়। এর ফলে হৃদপিণ্ড থেকে মস্তিষ্কে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয় এবং সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় বা হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তনের সময় মাথা ঘোরার অনুভূতি তীব্র রূপ ধারণ করে।

 

মাসিকের তীব্র ব্যথা ও ক্র্যাম্পের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও নারীদের মধ্যে মাথা ঘোরার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অনিয়মিত বা তীব্র জরায়ুর সংকোচনের কারণে নারীরা যে শারীরিক কষ্টের মুখোমুখি হন, তা অনেক সময় স্নায়ুতন্ত্রে এক ধরনের বিশেষ চাপ সৃষ্টি করে।

 

একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভ্যাসোভ্যাগাল প্রতিক্রিয়া বলা হয়। এই প্রতিক্রিয়ার ফলে শরীরের ভেগাস স্নায়ু অতিরিক্ত উদ্দীপিত হয়, যার ফলে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন হঠাৎ করেই অনেক কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, বমি বমি ভাব, চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসা এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাময়িকভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো আশঙ্কাজনক ঘটনা ঘটতে পারে।

 

মাসিকের সময় খাদ্যাভ্যাসের ব্যত্যয় এবং রক্তে শর্করার অভাবও মাথা ঘোরার অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পিরিয়ডের সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক নারীরই ক্ষুধামন্দা দেখা দেয় কিংবা বমি বমি ভাবের কারণে তারা নিয়মিত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।

 

দীর্ঘ সময় খাবার না খাওয়ার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। মস্তিষ্ক সচল রাখার জন্য গ্লুকোজ হলো প্রাথমিক জ্বালানি। তাই রক্তে শর্করার ঘাটতি দেখা দিলে মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে হিমশিম খায়, যার বাহ্যিক লক্ষণ হিসেবে মাথা ঘোরা, হাত-পা কাঁপা এবং মনোযোগের অভাব পরিলক্ষিত হয়।

 

মাসিক চক্রের সময় হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে কানের ভেতরের ভারসাম্য ব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গবেষণা সাময়িকী 'ব্রাজিলিয়ান জার্নাল অফ ওটোরিনোল্যারিঙ্গোলজি'-তে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

 

উক্ত গবেষণায় চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন যে, মাসিক চক্রের সময় ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোনের তীব্র ওঠানামা কীভাবে নারীদের শারীরিক ভারসাম্যহীনতা এবং মাথা ঘোরার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

গবেষকরা প্রমাণ করেছেন যে, এই দুই প্রধান নারী হরমোনের মাত্রার পরিবর্তন সরাসরি মানবদেহের অন্তঃকর্ণের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে। আমাদের শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে এবং মাথা স্থির রাখতে অন্তঃকর্ণের ভেতরের সূক্ষ্ম তরল পূর্ণ নালীগুলো মূল ভূমিকা পালন করে।

 

গবেষণায় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, মাসের নির্দিষ্ট সময়ে বা মাসিক শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিনগুলোতে যখন শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের সমতা পরিবর্তিত হয়, তখন শরীর কোষের ভেতরে অতিরিক্ত সোডিয়াম এবং পানি ধরে রাখতে শুরু করে।

 

এই তরল সঞ্চয়ের ফলে অন্তঃকর্ণের ভেতরে থাকা অতি সংবেদনশীল সূক্ষ্ম নালীগুলোর ওপর অতিরিক্ত তরলের চাপ সৃষ্টি হয়। এই বাড়তি চাপের কারণে মস্তিষ্ক শরীরের সঠিক অবস্থান ও ভারসাম্য সংক্রান্ত ভুল বার্তা পেতে শুরু করে, যার ফলে নারী মাথা ঘোরার তীব্র অনুভূতি ও হালকা বোধ করেন।

 

বৈজ্ঞানিক এই গবেষণায় পিরিয়ডের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী উভয় পর্যায়ে নারীদের শরীরের ভারসাম্যের সুনির্দিষ্ট পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন রেকর্ড করা হয়েছে। গবেষণার ফলাফল স্পষ্ট করে দেয় যে শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে থাকা এবং অন্তঃকর্ণে চাপ সৃষ্টি হওয়াই এই সমস্যাটির মূল বৈজ্ঞানিক উৎস।

 

বৈজ্ঞানিক গবেষণার এই উদ্ভাবন চিকিৎসকদের জন্য পিরিয়ডের সময় হওয়া মাথা ঘোরা নিরসনে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর চিকিৎসার পথ উন্মুক্ত করেছে। এই শারীরিক অস্বস্তি সামলানোর জন্য খাদ্যাভ্যাসে কৌশলগত পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।

 

বিশেষ করে মাসিক শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই দৈনন্দিন খাবারে বাড়তি লবণের ব্যবহার বা অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত খাবার পরিহার করা উচিত। খাবারে লবণের পরিমাণ কমিয়ে দিলে শরীরে বাড়তি তরল আটকে থাকার সম্ভাবনা বহুলাংশে হ্রাস পায়, যা অন্তঃকর্ণের ভেতরের চাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।

 

এর পাশাপাশি নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা মাথা ঘোরা প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়। আপাতদৃষ্টিতে বৈপরীত্য মনে হলেও, পর্যাপ্ত পানি পান করলে তা কিডনিকে সক্রিয় রাখে এবং শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত পানি ও সোডিয়াম প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দিতে সাহায্য করে।

 

একই সঙ্গে চা, কফি বা অ্যালকোহলের মতো ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পানের অভ্যাস কমিয়ে আনা প্রয়োজন। এই পানীয়গুলো শরীরকে ডিহাইড্রেটেড করে তোলে এবং অন্তঃকর্ণের তরল সমতা বিঘ্নিত করে মাথা ঘোরার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

 

খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাত্রায় সঠিক নিয়মকানুন মেনে চলা মাথা ঘোরার সমস্যা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ সময় খালি পেটে না থেকে অল্প পরিমাণে হলেও পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত বিরতিতে গ্রহণ করা উচিত।

 

এটি রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির রাখতে সাহায্য করে এবং হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে। রাতে পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম স্নায়ুতন্ত্রকে হরমোনজনিত চাপ সামলানোর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করে। প্রতিদিন হালকা হাঁটার মতো শরীরচর্চা করলে তা রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং শরীরের ফোলাভাব দূর করতে সাহায্য করে।

 

মাসিকের সময় যদি হঠাৎ মাথা ঘোরার অনুভূতি শুরু হয়, তবে তাৎক্ষণিক সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ হলো অনতিবিলম্বে বসে পড়া অথবা নিরাপদ স্থানে শুয়ে পড়া। মাথা ঘোরা অবস্থায় হেঁটে চলার চেষ্টা করলে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

 

এ সময় চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে তা স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বমি বমি ভাব অনেকটাই কমিয়ে আনে। সর্বোপরি, পিরিয়ডের সময় মাথা ঘোরার ঘটনাটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার সাময়িক পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির পূর্বাভাস হতে পারে।

 

যদি মাথা ঘোরার সঙ্গে তীব্র বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অনিয়ন্ত্রিত হৃদকম্পন, অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা বা সাময়িকভাবে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

 

তাছাড়া পিরিয়ডের সময় যদি প্রতি এক বা দুই ঘণ্টা পরপর প্যাড সম্পূর্ণ ভিজে যায়, রক্তে বড় আকারের জমাট দেখা যায় অথবা মাসিকের স্থায়িত্ব অস্বাভাবিক দীর্ঘ হয়, তবে সেখানে তীব্র রক্তশূন্যতা বা অন্য কোনো জটিল ধাত্রীবিদ্যাসংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও সচেতনতাই নারীর শারীরিক সুস্থতা ও স্বাভাবিক জীবনধারা নিশ্চিত করতে পারে।