এই পরিবর্তনের কারণে শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই নানা ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায়। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে মেজাজের আকস্মিক ওঠানামা, তলপেটে তীব্র ব্যথা বা ক্র্যাম্পস এবং নির্দিষ্ট কিছু খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা অরুচি তৈরি হওয়া বেশ পরিচিত।
তবে এই প্রচলিত লক্ষণগুলোর বাইরেও একটি বিশেষ শারীরিক প্রতিক্রিয়া অনেক নারীর ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। অনেকেই অভিযোগ করেন যে, পিরিয়ড চলাকালীন তাদের শরীরে অস্বাভাবিকভাবে অতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভূত হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অবস্থাকে ‘পিরিয়ড চিলস’ বা ঋতুস্রাবকালীন শীতবোধ বলা হয়ে থাকে। প্রথম দর্শনে এটিকে সাধারণ আবহাওয়া বা পরিবেশগত কারণ বলে মনে হলেও, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং জটিল কিছু বৈজ্ঞানিক ও শারীরবৃত্তীয় কারণ।
এই প্রতিবেদনটিতে আমরা সেই বৈজ্ঞানিক কারণগুলো এবং এর কার্যকরী প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। পিরিয়ডের সময় নারীদের শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠান্ডা অনুভূত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে হরমোনের আকস্মিক ওঠানামা।
নারীর মাসিক চক্র বা মেনস্ট্রুয়াল সাইকেলকে মূলত কয়েকটি ধাপে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ডিম্বস্ফোটন বা ওভুলেশন প্রক্রিয়ার পর শরীরে প্রোজেস্টেরন নামক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
এই প্রোজেস্টেরন হরমোন শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রাকে সামান্য পরিমাণে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু যখনই ডিম্বস্ফোটনের পর নিষেক ঘটে না এবং পিরিয়ড শুরু হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে, ঠিক তখনই রক্তে এই প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা খুব দ্রুতগতিতে নিচে নেমে যায়।
হরমোনের এই আকস্মিক পতনের কারণে শরীরের বর্ধিত তাপমাত্রাও হঠাৎ করে কমে স্বাভাবিক বা তার চেয়েও নিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। তাপমাত্রার এই নাটকীয় পরিবর্তনের ফলে নারীদের শরীরে, বিশেষ করে শরীরের প্রান্তীয় অংশ যেমন হাত ও পায়ে, তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হতে থাকে।
হরমোনের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি পিরিয়ড চলাকালীন অতিরিক্ত রক্তপাতও শীতবোধের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক নারীর ক্ষেত্রেই ঋতুস্রাবের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে।
দীর্ঘ সময় ধরে কিংবা প্রচুর পরিমাণে এই রক্তপাতের ফলে শরীর থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় লোহিত রক্তকণিকা বেরিয়ে যায়। লোহিত রক্তকণিকার অন্যতম প্রধান কাজ হলো শরীরের প্রতিটি কোষে এবং টিস্যুতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করা।
অক্সিজেন শরীরের বিপাকীয় কার্যাবলি সচল রেখে কোষে কোষে তাপ উৎপন্ন করতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে যখন শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়, তখন তা ধীরে ধীরে আয়রন-ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া বা আয়রনের অভাবজনিত রক্তশূন্যতার দিকে মোড় নেয়।
রক্তশূন্যতার কারণে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং টিস্যুগুলো পর্যাপ্ত অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হয়। ফলস্বরূপ, শরীর নিজেকে উষ্ণ রাখার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থার কারণে শুধুমাত্র ঠান্ডার প্রতি সংবেদনশীলতাই বৃদ্ধি পায় না, বরং চরম ক্লান্তি, শারীরিক দুর্বলতা এবং মাথা ঘোরার মতো মারাত্মক উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুপরিচিত জার্নাল ‘বিএমসি উইমেনস হেলথ’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বেশ কিছু নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে যে, পিরিয়ডের সময় শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব যে প্রক্রিয়া রয়েছে, তা সরাসরি হরমোনের পরিবর্তনের কারণে প্রভাবিত হয়।
এই সময় প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ ঘটে। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন মূলত হরমোনের মতো কাজ করে এবং এটি জরায়ুকে সংকুচিত করে পিরিয়ডের সময়কার রক্তপাত ঘটাতে সাহায্য করে। এই সংকোচনের ফলেই মূলত তলপেটে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়।
কিন্তু এই প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন শুধুমাত্র জরায়ুতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ হাইপোথ্যালামাস, যা মূলত আমাদের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রক বা থার্মোস্ট্যাট হিসেবে কাজ করে, এই প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের কারণে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়।
প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের প্রভাবে হাইপোথ্যালামাস সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। যার ফলে শরীরে প্রকৃত কোনো জ্বর না থাকলেও, জ্বরের সময় যেমন শীত শীত বা কাঁপুনি অনুভূত হয়, ঠিক তেমনি একটি অবাস্তব অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
উক্ত গবেষণায় আরও একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, পিরিয়ডের সময় জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ বা এন্ডোমেট্রিয়াম খসে পড়ার প্রক্রিয়াকে সহজতর করার জন্য শরীরের নিজস্ব একটি প্রতিরক্ষা বা সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে।
এই সময় শরীর তার রক্তপ্রবাহের একটি বিশাল অংশ শরীরের অন্যান্য প্রান্তীয় অঙ্গ থেকে সরিয়ে নিয়ে শ্রোণী অঞ্চল বা পেলভিক এলাকার দিকে প্রবাহিত করে। যেহেতু রক্ত আমাদের শরীরের উষ্ণতা ধরে রাখার অন্যতম মাধ্যম, তাই যখন উষ্ণ রক্তের একটি বড় অংশ শরীরের কেন্দ্রস্থলে অর্থাৎ জরায়ু অঞ্চলে ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই হাত ও পায়ের মতো প্রান্তীয় অঙ্গগুলোতে রক্ত সঞ্চালন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
আর রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ার এই প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবেই হাত ও পা বরফের মতো জমে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। এর পাশাপাশি, পিরিয়ডের সময় ব্যথার কারণে অনেক নারীরই খাবারে অরুচি দেখা দেয়, পর্যাপ্ত ঘুম হয় না এবং শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়।
এই প্রতিটি বিষয় সম্মিলিতভাবে শরীরের বিপাকীয় হারকে কমিয়ে দেয়, যা শরীরকে আরও বেশি ঠান্ডা ও দুর্বল করে তোলে। পিরিয়ড চলাকালীন এই অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগার সমস্যা বা পিরিয়ড চিলস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু বিজ্ঞানসম্মত ও অত্যন্ত কার্যকরী উপায় অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন।
যেহেতু পিরিয়ডের সময় প্রচুর পরিমাণে তরল শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, তাই সবার আগে শরীরে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন নিয়ম করে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। এর পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
যেহেতু অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে আয়রনের ঘাটতি হয়, তাই আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি, মসুর ডাল, বিভিন্ন ধরনের শিম বা বীজ, তিল এবং চর্বিহীন মাংস অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে।
তবে শুধুমাত্র আয়রন গ্রহণ করলেই হবে না, শরীর যাতে সেই আয়রন সঠিকভাবে শোষণ করতে পারে, সেজন্য ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারও সমানভাবে গ্রহণ করতে হবে। লেবু, কমলালেবু, মাল্টা বা পেয়ারার মতো ভিটামিন সি যুক্ত ফল আয়রন শোষণের হারকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় এবং শরীরকে সতেজ রাখে।
খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাত্রায় কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন এই সমস্যা সমাধানে দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। শীতবোধ কমানোর জন্য পোশাকের ক্ষেত্রে লেয়ারিং বা স্তরে স্তরে পোশাক পরার পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
একটি ভারী পোশাক পরার চেয়ে কয়েকটি হালকা পোশাক স্তরে স্তরে পরলে তা শরীরের ভেতরের তাপকে বাইরে বের হতে দেয় না এবং শরীরকে দীর্ঘক্ষণ উষ্ণ রাখে। এছাড়া শরীরের ভেতর থেকে উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত বিরতিতে গরম পানীয় যেমন-আদা চা, গ্রিন টি, ভেষজ চা বা গরম স্যুপ পান করা যেতে পারে।
এই গরম পানীয়গুলো শুধুমাত্র শরীরকেই উষ্ণ করে না, বরং তলপেটের পেশিগুলোকে শিথিল করে ক্র্যাম্প বা ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে। সর্বোপরি, নিজেকে শারীরিকভাবে যতটা সম্ভব সক্রিয় রাখার চেষ্টা করতে হবে।
হালকা হাঁটাচলা বা সামান্য স্ট্রেচিং শরীরের রক্ত সঞ্চালনকে স্বাভাবিক রাখে, যা হাত ও পায়ে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ ও উষ্ণ রাখতে সহায়তা করে। পিরিয়ডের সময় ঠান্ডা লাগা একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া হলেও, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে এই অস্বস্তিকর সময়টিকে অনেকটাই আরামদায়ক করে তোলা সম্ভব। তবে সমস্যা যদি অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, তবে অবশ্যই কালক্ষেপণ না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।