এই সুদীর্ঘ যাত্রায় যিনি অধিকাংশ সময় লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে সংসারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেন, তিনি হলেন একজন স্ত্রী। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের খুঁটিনাটি খেয়াল রাখা থেকে শুরু করে স্বামীর যেকোনো কঠিন ও দুঃসময়ে সবচেয়ে বিশ্বস্ত নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠেন তিনি।
নিজের শত শারীরিক ক্লান্তি ও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে সযত্নে আড়াল করে হাসিমুখে সব দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার এই যে নীরব আত্মত্যাগ, তা অনেক সময়ই প্রাত্যহিক জীবনের যান্ত্রিকতায় আমাদের আলাদাভাবে স্বীকার করা হয়ে ওঠে না।
প্রিয় মানুষটির এই না-বলা কথাগুলো শোনা এবং তার প্রতি অব্যক্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যই আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘স্ত্রীর প্রশংসা দিবস’। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং আধুনিক সমাজব্যবস্থায় এই দিবসটির একটি বিশেষ ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য রয়েছে।
তথ্যমতে, ২০০৬ সালে পশ্চিমা বিশ্বে সর্বপ্রথম এই দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক রীতি শুরু হয়। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় রোববার দিনটিকে স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিশেষ দিন হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। সেখান থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এই ধারণাটি ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
মূলত দাম্পত্য জীবনে একজন স্ত্রীর অপরিসীম অবদান, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও অন্তহীন যত্নের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে গভীর সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই এই দিনটির অবতারণা করা হয়েছে। একটি সুস্থ, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল সমাজ বিনির্মাণে পারিবারিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি, আর সেই স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলার মূল ভিত্তিই হলেন পরিবারের নারী তথা স্ত্রী।
দাম্পত্য জীবনের শুরুর দিকে একে অপরকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, ছোটখাটো বিষয়ে প্রশংসা করা কিংবা ভালোবাসার অনুভূতিগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয় থাকে। কিন্তু সময়ের পালাবদলে সংসার, কর্মজীবন, সন্তান লালন-পালন এবং পারিপার্শ্বিক নানা দায়িত্বের চাপে সেই সুন্দর অভ্যাসগুলো অনেকটাই ম্লান হতে শুরু করে।
একই ছাদের নিচে বসবাস করেও কখনো কখনো দুজনের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য নীরবতা বা দূরত্বের দেয়াল তৈরি হয়। অথচ যেকোনো মানুষের জন্যই তার সবচেয়ে কাছের ও প্রিয় মানুষটির মুখে নিজের কাজ বা অস্তিত্বের সামান্য স্বীকৃতি শুনতে পারাটা পরম আনন্দের।
দীর্ঘ আট বছরের একটি সফল দাম্পত্য পথচলা হোক কিংবা কয়েক দশকের পুরোনো সংসার-একজন প্রিয়তমা ও জীবনসঙ্গী সব সময়ই তার সঙ্গীর কাছ থেকে একটু বাড়তি মনোযোগ ও ইতিবাচক মূল্যায়ন প্রত্যাশা করেন। আজ তাই সব ধরনের বৈষয়িক ব্যস্ততার মাঝেও কিছুটা সময় বের করে সেই জমে থাকা নীরবতা ভাঙার উপযুক্ত দিন।
সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, সম্পর্কের মধ্যে নিয়মিত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস দাম্পত্য জীবনকে কেবল দীর্ঘস্থায়ীই করে না, বরং উভয় সঙ্গীর মানসিক প্রশান্তি ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে অভাবনীয় ভূমিকা পালন করে।
স্ত্রীর প্রশংসা করার অর্থ এই নয় যে, তাকে অত্যন্ত দামি বা বিলাসবহুল কোনো উপহার দিয়ে চমকে দিতে হবে। বরং ছোট ছোট আন্তরিক উদ্যোগই সম্পর্কের গভীরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে একগুচ্ছ সতেজ ফুল নিয়ে আসা, তার পছন্দের কোনো খাবার কিনে দেওয়া কিংবা হঠাৎ কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই দুজন মিলে বাইরে কোথাও সময় কাটাতে যাওয়া হতে পারে এই দিনের চমৎকার কিছু আয়োজন।
অনেকে স্ত্রীর পছন্দ অনুযায়ী সুগন্ধি, অলংকার কিংবা আংটির মতো উপহার দিয়েও নিজেদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন। শত শত বছর ধরে প্রিয়জনকে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে আংটি উপহার দেওয়ার রীতি পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতেই প্রচলিত রয়েছে।
তবে যেকোনো বস্তুতান্ত্রিক উপহারের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও আবেদনময় হতে পারে নিজের হাতে লেখা একটি সাধারণ চিঠি। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের এই যুগে একটি কাগজে লেখা চিঠিতে এমন অনেক না-বলা কথা প্রকাশ করা সম্ভব, যা প্রতিদিনের আলাপে হয়তো কখনো বলা হয়ে ওঠে না।
সেই চিঠিতে খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সংসারের আড়ালে তার করা প্রতিটি ছোট কাজ সঙ্গীর চোখে পড়ে, তার প্রতিটি ত্যাগের প্রকৃত মূল্য সঙ্গী অনুধাবন করেন। জীবনের প্রতিটি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং মুহূর্তে তার মতো একজন নির্ভরযোগ্য মানুষকে পাশে পাওয়াটা কতটা স্বস্তির ও পরম সৌভাগ্যের, সেটিও অত্যন্ত আন্তরিকভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে।
মানুষের জীবনে সম্পর্কের বহুমাত্রিক রূপ রয়েছে। কারও কাছে স্ত্রী মানেই গভীর প্রেমের মানুষ, কারও কাছে তিনি জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কাছের বন্ধু, আবার কারও কাছে তিনি দুর্যোগ ও সংকটের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
সম্পর্কের এই ধরন বা সমীকরণ যেমনই হোক না কেন, একজন জীবনসঙ্গীর প্রতি নিঃশর্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ কখনোই হাতছাড়া করা উচিত নয়। সত্য যে, ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না।
বছরের প্রতিটি দিনই প্রিয় মানুষটিকে ভালোবাসা, সম্মান ও যত্ন করা যায়। তবু বিশ্বজুড়ে পালিত হওয়া এমন একটি বিশেষ দিন যদি প্রাত্যহিক যান্ত্রিকতার এই যুগে আমাদের সেই ভুলে যাওয়া দায়িত্বগুলো আরেকবার মনে করিয়ে দেয়, তবে তা নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক।
তাই আজ সব ধরনের মান-অভিমান ও জাগতিক ব্যস্ততাকে দূরে সরিয়ে রেখে, সেই মানুষটির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো হোক, যিনি তার পরম মায়া ও নিবিড় যত্নে প্রাত্যহিক জীবনকে একটু একটু করে সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তোলেন।