শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অল্প বয়সে অতিরিক্ত চুল পড়ার নেপথ্যের কারণ, প্রতিরোধের উপায়

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম

অল্প বয়সে অতিরিক্ত চুল পড়ার নেপথ্যের কারণ, প্রতিরোধের উপায়
ছবি : Collected

মানবদেহের বাহ্যিক সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও ঘন চুল, যা মূলত মানুষের ত্বকেরই একটি বিশেষ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অন্যতম বড় একটি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অকালে চুল ঝরে যাওয়া বা মাথার ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়ার সমস্যা।

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিন স্বাভাবিক নিয়মে কিছু পরিমাণ চুল ঝরে যাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তবে প্রতিদিন যদি একশোর বেশি চুল ক্রমাগত ঝরে যেতে থাকে, তবে তা মাথার ত্বক ফাঁকা হওয়া বা টাক পড়ার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেই বিবেচিত হয়।

 

বিশেষজ্ঞদের সুচিন্তিত মতানুসারে, অল্প বয়সে এই অপ্রত্যাশিত চুল পড়ার পেছনে মূলত জিনগত পরিবর্তন, হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা, পরিবেশগত দূষণ এবং জীবনযাত্রার চরম অনিয়ম-এই বিষয়গুলোর এক জটিল সমীকরণ প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে।

 

অল্প বয়সে চুল ঝরে পড়ার অন্যতম বৈজ্ঞানিক কারণ হলো মানবদেহে হরমোনের আকস্মিক ভারসাম্যহীনতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, মানবদেহে টেস্টোস্টেরন নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন বিদ্যমান থাকে।

 

কোনো বিশেষ কারণে এই হরমোনটি যখন পরিবর্তিত হয়ে ডাই-হাইড্রোটেস্টোস্টেরন বা ডিএইচটি-তে রূপান্তরিত হতে শুরু করে, তখন তা মাথার ত্বকে থাকা চুলের ক্ষুদ্র ফলিকলগুলোকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে ফেলে।

 

এর ফলস্বরূপ, চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে অকালেই চুল পাতলা হতে শুরু করে এবং চিরতরে ঝরে পড়ে। এই হরমোনজনিত সমস্যার পাশাপাশি আধুনিক নাগরিক জীবনের চরম মানসিক চাপ তরুণদের চুল পড়ার হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

ক্যারিয়ার গঠন কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের নানামুখী তীব্র চাপের কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রা মানবদেহে টেলোজেন এফ্লুভিয়াম নামক এক জটিল শারীরবৃত্তীয় অবস্থার সৃষ্টি করে।

 

এই অবস্থার প্রভাবে কোনো দৃশ্যমান পূর্বলক্ষণ ছাড়াই হঠাৎ করে মাথা থেকে বিপুল পরিমাণে চুল ঝরে যেতে শুরু করে, যা আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। হরমোন ও মানসিক চাপের পাশাপাশি দৈনন্দিন চরম পুষ্টিহীনতা এবং পরিবেশগত দূষণও চুল পড়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

একটি স্বাস্থ্যকর ও মজবুত চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য উপাদান হলো প্রোটিন, বায়োটিন ও আয়রন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের ফাস্টফুড নির্ভর খাদ্যাভ্যাসে এসব প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের চরম ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।

 

এর সাথে নিত্যদিন যুক্ত হয়েছে শহুরে জীবনের মাত্রাতিরিক্ত ধুলোবালি, ভয়াবহ বায়ুদূষণ এবং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত পানিতে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান বা শক্ত পানি। এসব বাহ্যিক দূষণ সরাসরি চুলের গোড়াকে দুর্বল, শুষ্ক ও প্রাণহীন করে তোলে।

 

অকালে এই টাক পড়া রোধ করতে হলে প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, চুল পরিষ্কার রাখার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানমুক্ত, বিশেষ করে সালফেট ও প্যারাবেনমুক্ত সম্পূর্ণ মৃদু শ্যাম্পু ব্যবহার করা উচিত।

 

চুল ধোয়ার পর মাথার ত্বকে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করতে প্রাকৃতিক ময়শ্চারাইজার হিসেবে সামান্য উষ্ণ ক্যাস্টর অয়েল বা খাঁটি নারকেল তেল দিয়ে নিয়মিত মালিশ করা অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি।

 

যেহেতু মানুষের চুল মূলত কেরাটিন নামক এক বিশেষ ধরনের প্রোটিন দিয়ে তৈরি হয়, তাই চুলের হারানো স্বাস্থ্য ফেরাতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ডিম, সামুদ্রিক মাছ, সয়াবিন, পালং শাক এবং পুষ্টিকর বাদাম রাখা অপরিহার্য।

 

এছাড়া, প্রাকৃতিক ডিএইচটি ব্লকার হিসেবে পরিচিত কুমড়োর বীজ, গ্রিন টি এবং আমলকী নিয়মিত গ্রহণ করলে হরমোনজনিত চুল পড়া অনেকটাই প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। চুলের ঘনত্ব ও বৃদ্ধি বজায় রাখতে আধুনিক ঘরোয়া পদ্ধতি ও দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তনের ওপরও জোর দিয়ে থাকেন ত্বক বিশেষজ্ঞরা।

 

এর মধ্যে অন্যতম পদ্ধতি হলো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডার্মারোলারের পরিমিত ব্যবহার। এই যন্ত্রটি মাথার ত্বকে সূক্ষ্ম ছিদ্র তৈরি করে কোলাজেন নামক প্রোটিনের উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং হেয়ার সিরামের গভীর শোষণ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা নতুন চুল গজানোর ক্ষেত্রে উদ্দীপক ভূমিকা পালন করে।

 

এর পাশাপাশি, ধূমপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা আবশ্যক। গবেষণায় প্রমাণিত যে, ধূমপানের বিষাক্ত উপাদানগুলো চুলের ফলিকলে রক্ত প্রবাহকে ব্যাহত করে চুলকে মৃতপ্রায় করে তোলে। তাই চুল পড়া রোধে ধূমপান ত্যাগের বিকল্প নেই।

 

একইসঙ্গে, প্রতিদিন অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করতে হবে, কারণ সম্পূর্ণ বিশ্রামের এই নির্দিষ্ট সময়েই মানবদেহের ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো প্রাকৃতিকভাবে নিজেদের মেরামত করার সুযোগ পায়।

 

যখন খাদ্যাভ্যাস ও সাধারণ জীবনযাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমেও চুল পড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না, তখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে চুল পড়া রোধে এবং মাথার ত্বকে নতুন চুল গজাতে অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে।

 

চিকিৎসকদের মতে, চুলের বৃদ্ধি ও পুষ্টি সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে হেয়ার বালবের সাথে যুক্ত থাকা শিরা-উপশিরাগুলোর সুস্থতার ওপর। তাই আধুনিক চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে ত্বকের গভীরে থাকা হেয়ার বালবে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে চুলের গোড়ায় নিরবচ্ছিন্ন পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করা।

 

রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, চুল পড়া রোধকারী লোশন বা মেডিকেটেড শ্যাম্পু ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বর্তমানে অ্যান্ড্রোজেনিক অ্যালোপেশিয়া বা বংশগত টাক পড়ার সমস্যায় মেসোথেরাপি এবং প্লেটলেট রিচ প্লাজমা বা পিআরপি থেরাপির মতো অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে।

 

তবে মনে রাখতে হবে যে, চুলের যেকোনো চিকিৎসাই মূলত দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। রাতারাতি এর ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই এ ধরনের চিকিৎসায় অত্যন্ত ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, যার পাশাপাশি সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা অপরিহার্য।