বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সময়ের আগে ঋতুস্রাব বা মাসিক হওয়ার কারণসমূহ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:০২ পিএম

সময়ের আগে ঋতুস্রাব বা মাসিক হওয়ার কারণসমূহ
ছবি: সংগৃহীত

নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া হলো মাসিক বা ঋতুস্রাব। তবে অনেক সময় নির্ধারিত তারিখের কয়েক দিন আগেই মাসিক শুরু হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে স্বভাবতই নারীদের মনে নানা ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়।

 

অনেকেই ভাবতে শুরু করেন যে, শরীরে জটিল কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা বাসা বেঁধেছে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, সময়ের আগে ঋতুস্রাব হওয়া মানেই কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণ নয়। দৈনন্দিন জীবনে মাঝে মাঝে এমনটা ঘটা খুব বেশি চিন্তার কারণ নয়।

 

তবে স্বাভাবিক মাসিক চক্রে যদি ধারাবাহিকভাবে ও বারবার এমন পরিবর্তন আসতে থাকে, তবে বিষয়টি মনোযোগের দাবি রাখে। মাসিক চক্র এক মাস থেকে অন্য মাসে সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে। মানসিক চাপ, ওজনের আকস্মিক পরিবর্তন, শারীরিক ব্যায়াম, দীর্ঘ ভ্রমণ এবং হরমোনযুক্ত জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতির ব্যবহার মাসিক চক্রকে প্রভাবিত করতে পারে।

 

এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হলো মাসিক কতটা আগে শুরু হয়েছে তা নয়, বরং এটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। মাঝে মাঝে প্রত্যাশিত সময়ের কয়েক দিন আগে মাসিক শুরু হওয়াটা খুব কম ক্ষেত্রেই গুরুতর কোনো স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

 

বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ক্ষেত্রেই এই চক্র মাসভেদে কয়েক দিনের তারতম্য ঘটাতে পারে। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কারণ কোনো ডাক্তারি সমস্যা ছাড়াই ঋতুস্রাবকে এগিয়ে আনতে সক্ষম। সাধারণত মাসিকের প্রথম দিন থেকে পরবর্তী মাসিকের প্রথম দিন পর্যন্ত সময়কালকে একটি মাসিক চক্র ধরা হয়।

 

প্রাপ্তবয়স্ক নারীর জন্য একুশ থেকে পঁয়ত্রিশ দিনের একটি চক্রকে চিকিৎসকেরা স্বাভাবিক পরিসর বলে মনে করেন। অর্থাৎ, স্বাভাবিকের চেয়ে দুই বা তিন দিন আগে রক্তপাত শুরু হওয়া মানেই প্রজননতন্ত্রে কোনো সমস্যা আছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

 

তবে ধারাবাহিকভাবে সময়ের আগে রক্তপাত হওয়ার ধারা তৈরি হলে, বা চক্রে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলে সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। প্রত্যাশিত সময়ের আগে মাসিক শুরু হওয়ার পেছনে কেবল একটি নির্দিষ্ট কারণ দায়ী থাকে না।

 

মস্তিষ্ক, ডিম্বাশয় এবং প্রজনন হরমোনগুলোর মধ্যে একটি জটিল মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রিত হয়। বর্তমান সময়ের ব্যস্ত জীবনে কাজের চাপ, মানসিক উদ্বেগ, অপর্যাপ্ত ঘুম বা জীবনের কোনো বড় পরিবর্তন ডিম্বস্ফোটনের সঙ্গে জড়িত হরমোন সংকেতকে ব্যাহত করতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক সাময়িকী 'দ্য ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অন দ্য বায়োলজি অব স্ট্রেস'-এর গবেষণা অনুসারে, মানসিক চাপ মাসিক চক্র চলাকালীন নারীর শরীরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ঋতুস্রাবকে একটি বিরক্তিকর প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করলে তা 'প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম' বা পিএমএস-এর লক্ষণগুলোকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে।

 

এছাড়া শরীরের ওজনের বড় পরিবর্তন প্রজনন হরমোনগুলোর স্বাভাবিক মাত্রাকে প্রভাবিত করে। ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, উভয় ক্ষেত্রেই এই হরমোনাল তারতম্য ঘটতে পারে। নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং মাত্রাতিরিক্ত ব্যায়ামও প্রজননতন্ত্রের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

 

হঠাৎ কঠিন শারীরিক কসরত শুরু করা বা পর্যাপ্ত পুষ্টি ছাড়া ভারী ব্যায়াম করা মাসিকের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে ব্যাহত করে। যদিও পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস-এর মতো সমস্যায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রার ব্যায়াম মাসিক চক্র নিয়মিত করতে সাহায্য করতে পারে।

 

দীর্ঘ ভ্রমণ, দীর্ঘ বিমান যাত্রাজনিত ক্লান্তি, রাত জাগার অভ্যাস এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় হঠাৎ পরিবর্তন শরীরের হরমোনের ছন্দকে সাময়িকভাবে এলোমেলো করে দেয়। তবে নির্দিষ্ট মাসে তীব্র চাপের কারণে সময়ের আগেই রক্তপাত শুরু হলে, তার মানে এই নয় যে নেপথ্যে স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত সমস্যা লুকিয়ে রয়েছে।

 

হরমোনযুক্ত গর্ভনিরোধক পদ্ধতি শুরু করা বা পরিবর্তন করার ফলেও রক্তপাতের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। এসব পদ্ধতির মধ্যে হরমোন বড়ি, ইনজেকশন এবং জরায়ুর অভ্যন্তরে ব্যবহৃত জন্মবিরতিকরণ উপকরণ অন্তর্ভুক্ত।

 

চল্লিশের কোঠায় থাকা নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্রের পরিবর্তন ঋতুবন্ধ হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পেরিমেনোপজ বলা হয়। এই সময়ে মাসিকের স্থায়িত্ব কম বা চরম অনিয়মিত হতে পারে।

 

কখনও কখনও মাসিকের সময়ে বারবার আসা পরিবর্তনগুলো অন্তর্নিহিত শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। এই জটিলতাগুলোর মধ্যে থাইরয়েডের সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা, জরায়ুর ফাইব্রয়েড, জরায়ুর পলিপ এবং জরায়ু থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাতের অন্যান্য কারণ উল্লেখযোগ্য।

 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংগঠন 'আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস' তাদের নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, একুশ দিনের কম সময়ের মাসিক চক্র, মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত এবং নিয়মিততায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন জরায়ু থেকে হওয়া অস্বাভাবিক রক্তপাতের পর্যায়ে পড়ে। এ ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ স্ত্রীরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া একান্ত জরুরি।