এই পানীয়টি মূলত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর, যা মানুষের হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজম বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি আদর্শ পানীয় হলেও, গর্ভাবস্থার মতো একটি সংবেদনশীল শারীরিক অবস্থায় দৈনন্দিন খাবার ও পানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান বেশ কিছু ভিন্ন মাপকাঠি বিবেচনা করে থাকে।
একজন সাধারণ মানুষের জন্য যে খাবারটি অত্যন্ত উপকারী বলে বিবেচিত হয়, গর্ভাবস্থায় সেটি মাতৃগর্ভের ভ্রূণের জন্য সমানভাবে উপকারী বা নিরাপদ না-ও হতে পারে। তাই এই বিশেষ সময়ে সবুজ চা পানের ক্ষেত্রে সচেতনতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।
গর্ভাবস্থায় সবুজ চা পান করা যাবে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসাবিদ ও পুষ্টিবিদদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মতে, গর্ভাবস্থায় এই চা পান করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়, তবে এর পরিমাণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা অপরিহার্য।
চিকিৎসকরা বলছেন, গর্ভাবস্থার খাদ্যতালিকায় এটি যুক্ত করলে যে তা মায়ের বা অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক কোনো উন্নতি সাধন করবে, এমন দাবির পক্ষে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
বরং উল্টোদিকে ক্যাফেইন গ্রহণ, শরীরে ফোলেট বা ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি এবং আয়রন শোষণে বাধা সৃষ্টির মতো কিছু স্বল্প-পরিচিত কিন্তু গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, যা প্রত্যেক হবু মায়ের জেনে রাখা প্রয়োজন।
এই পানীয়টি গর্ভাবস্থায় আদৌ কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারিতা দেয় কি না, তার উত্তরটি কিছুটা জটিল। সবুজ চায়ে ‘ক্যাটেচিন’ নামক এক বিশেষ ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই উপাদানটি হৃৎপিণ্ড ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য উপকারী।
কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য জার্নালগুলোতে প্রকাশিত এই গবেষণাগুলোর সিংহভাগই পরিচালিত হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর; গর্ভবতী নারীদের শারীরিক কাঠামোর ওপর এর প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা এখনো হয়নি। দৈনন্দিন তরলের চাহিদা মেটাতে কেউ চাইলে এই চা পান করতে পারেন, তবে এই বৈশিষ্ট্যটি কেবল সবুজ চায়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়।
বিশুদ্ধ পানি বা গর্ভাবস্থার জন্য উপযুক্ত অন্যান্য নিরাপদ পানীয় গ্রহণ করেও তরলের এই শূন্যতা সহজেই পূরণ করা সম্ভব। সুতরাং, গর্ভাবস্থায় সবুজ চা পানের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত উপকারিতার পক্ষে যে প্রমাণগুলো রয়েছে, তা এর সম্ভাব্য ঝুঁকি বা উদ্বেগের তুলনায় নিতান্তই সীমিত।
গর্ভাবস্থায় সবুজ চা পানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো এর ক্যাফেইন উপাদান। ক্যাফেইন এমন একটি উদ্দীপক, যার মাত্রা সম্পর্কে গর্ভবতী নারীদের অত্যন্ত সচেতন থাকা বাঞ্ছনীয়। চায়ের নির্দিষ্ট ধরন, পরিবেশনের পরিমাণ এবং চা তৈরির পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে ক্যাফেইনের মাত্রা পরিবর্তিত হয়।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, গর্ভবতী নারীদের দিনে কোনোভাবেই ২০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করা উচিত নয়। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন যে, এই ২০০ মিলিগ্রামের হিসাবটি কেবল এক কাপ চায়ের ক্ষেত্রে নয়; বরং সারা দিনে পান করা সাধারণ চা, কালো চা, কফি, কোমল পানীয়, শক্তিবর্ধক পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস, চকোলেট এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ বা সাপ্লিমেন্টের মধ্যে থাকা মোট ক্যাফেইনের সমন্বিত পরিমাণ।
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে এই পরিমাণের বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রজনন বিষবিদ্যা বিষয়ক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাগুলো ক্যাফেইনের প্রভাব নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মাতৃদুগ্ধ বা মায়ের রক্ত থেকে ক্যাফেইন অত্যন্ত সহজেই গর্ভফুল বা প্ল্যাসেন্টা অতিক্রম করতে সক্ষম।
গর্ভফুল হলো মায়ের শরীরের সেই অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ, যার মাধ্যমে মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠা শিশুর কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্য, পুষ্টি ও জীবনদায়ী অক্সিজেন পৌঁছায়। গবেষকরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের সঙ্গে নবজাতকের জন্মকালীন ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাত এবং শিশুর জন্মগত হৃদ্রোগের মতো জটিল শারীরিক সমস্যার একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও চিন্তার বিষয় হলো, কিছু আধুনিক চিকিৎসা পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, মায়েরা যখন দৈনিক ২০০ মিলিগ্রামের বহুল স্বীকৃত নিরাপদ সীমার চেয়েও কম মাত্রায় ক্যাফেইন গ্রহণ করেন, তখনও এই স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
এর সোজা অর্থ হলো, গর্ভাবস্থায় ক্যাফেইন গ্রহণের কোনো চূড়ান্ত ও সুস্পষ্ট নিরাপদ মাত্রা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখনো নির্ধারিত নেই। তাই অনাগত সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বার্থে ক্যাফেইনের ব্যবহার যতটা সম্ভব কমিয়ে আনাই হলো সবচেয়ে বিচক্ষণ ও নিরাপদ উপায়।
ক্যাফেইনের পাশাপাশি সবুজ চা এবং শরীরে ফোলেট শোষণের সম্পর্কটিও গর্ভাবস্থায় অত্যন্ত মনোযোগের দাবি রাখে। গর্ভাবস্থার শুরুর দিকের সময়টাতে ফোলেট বা ফলিক অ্যাসিড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান।
এই সময়ে মাতৃগর্ভে শিশুর স্নায়ুনালি বা নিউরাল টিউব গঠিত হয়, যা পরবর্তীতে শিশুর পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডে রূপান্তরিত হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, সবুজ চায়ে প্রচুর পরিমাণে ক্যাটেচিন থাকে।
চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, চায়ের এই শক্তিশালী যৌগগুলো শরীরে ফোলেটের প্রাপ্যতা বা বিপাকীয় প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ক্যাটেচিন মায়ের শরীরে ফোলেট শোষণ এবং সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করার স্বাভাবিক ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
অথচ গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকে শিশুর স্নায়ুনালির যেকোনো ত্রুটি প্রতিরোধ করার জন্য শরীরে পর্যাপ্ত মাত্রায় ফোলেটের উপস্থিতি অপরিহার্য। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এই প্রমাণগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যার পরামর্শ দিয়েছেন।
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক পুষ্টি বিষয়ক গবেষণা পর্যালোচনা বা মেটা-অ্যানালাইসিসে গর্ভধারণের সময় চা পানের সামগ্রিক প্রভাব নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। সেই গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে যে, পরিমিত মাত্রায় চা পানের ফলে শিশুর স্নায়ুনালির ত্রুটি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ঢালাওভাবে এমনটি বলা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও ভুল হবে যে, গর্ভাবস্থায় সবুজ চা পান করলেই শিশুর স্নায়ুনালিতে ত্রুটি দেখা দেবে। মোদ্দাকথা হলো, গর্ভাবস্থায় সবুজ চা পান একেবারে নিষিদ্ধ না হলেও, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো এড়িয়ে চলতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এর মাত্রা কঠোরভাবে সীমিত রাখা এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করাই হলো একজন দায়িত্বশীল হবু মায়ের প্রধান কর্তব্য।