সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিমের বিকল্প হিসেবে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন উচ্চ প্রোটিনযুক্ত এই ১৩টি পুষ্টিকর খাবার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:০৮ পিএম

ডিমের বিকল্প হিসেবে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন উচ্চ প্রোটিনযুক্ত এই ১৩টি পুষ্টিকর খাবার
ছবি: সংগৃহীত

সুস্থ, সতেজ ও কর্মক্ষম শরীর গঠনের জন্য প্রতিদিনের সুষম খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার রাখা অপরিহার্য। মানবদেহের পেশি গঠন, কোষের স্বাভাবিক ক্ষয়পূরণ, হাড়ের সুস্থতা এবং সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

সহজলভ্য, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে বিশ্বজুড়েই প্রোটিনের আদর্শ উৎস হিসেবে ডিম আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি সমাদৃত। পুষ্টিবিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের সাধারণ সেদ্ধ ডিমে গড়ে প্রায় ছয় গ্রাম প্রোটিন থাকে।

 

বিশেষ করে যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান বা শারীরিক কসরত করেন, তাদের জন্য ডিম একটি অত্যন্ত কার্যকরী খাবার। কিন্তু আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা ব্যক্তিগত রুচি, খাদ্যাভ্যাস কিংবা স্বাস্থ্যগত নানা বিধিনিষেধের কারণে ডিম খেতে পারেন না বা ডিমের গন্ধ অপছন্দ করেন।

 

আবার প্রতিদিন সকালের নাশতায় একই খাবার খেতে খেতে অনেকের একঘেয়েমি চলে আসে। এমন পরিস্থিতিতে ডিমের বিকল্প হিসেবে কী খাওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন।

 

তবে আশার কথা হলো, আমাদের দৈনন্দিন পরিচিত খাবারের তালিকাতেই এমন অন্তত তেরোটি পুষ্টিকর খাবার রয়েছে, যেগুলো ডিমের চেয়েও অনেক বেশি প্রোটিন সমৃদ্ধ। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দিনের যেকোনো বেলার আহারে এগুলো অনায়াসে যুক্ত করে প্রোটিনের ঘাটতি মেটানো সম্ভব।

 

উদ্ভিদভোজী বা যারা দৈনন্দিন খাবারে নিরামিষ পছন্দ করেন, তাদের জন্য প্রকৃতিতে প্রচুর উচ্চ প্রোটিনযুক্ত বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মসুর ডাল ও ছোলা। ডাল বাঙালির রোজকার খাবার, আর এক কাপ মসুর ডালে প্রায় ষোলো গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়, যা শরীরের শক্তির দারুণ জোগান দেয়।

 

অন্যদিকে, আড়াইশ গ্রাম ছোলায় প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় চৌদ্দ গ্রাম। এটি ভালোভাবে সেদ্ধ করে, সালাদের সঙ্গে কিংবা তরল ঝোলের ভেতর মিশিয়ে খাওয়া অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। শিমের বিচিও এই পুষ্টির দৌড়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই; এক কাপ রান্না করা শিমের বিচি থেকে অন্তত পনেরো গ্রাম প্রোটিন পাওয়া সম্ভব।

 

পাশাপাশি, বিভিন্ন সবজির বীজও প্রোটিন ও খনিজ উপাদানের চমৎকার উৎস। অনেকেই মিষ্টিকুমড়ার বীজ অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে দেন, যা একটি বড় ভুল। ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা এক কাপ মিষ্টিকুমড়ার বীজে বারো গ্রাম প্রোটিনের উপস্থিতি রয়েছে।

 

একইসঙ্গে এটি জিংক, কপার, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও সেলেনিয়ামের মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের চাহিদা মেটায়। এর চেয়েও বেশি পরিমাণ প্রোটিন মেলে চিয়া সিডে। এক কাপ চিয়া সিডে প্রায় চল্লিশ গ্রাম প্রোটিন থাকে, যা একইসঙ্গে হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারি ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড ও হজমে সহায়ক ফাইবারের অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি উৎস।

 

এছাড়া যারা প্রাণিজ মাংসের বিকল্প খোঁজেন, তাদের জন্য সয়া নাগেট চমৎকার একটি উপাদান। বাজারে সহজেই পাওয়া যাওয়া প্যাকেটজাত প্রতি একশো গ্রাম সয়া নাগেটে ছত্রিশ গ্রাম বিশুদ্ধ প্রোটিন বিদ্যমান থাকে।

 

দুগ্ধজাত পুষ্টিকর খাবার এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের উৎসগুলোও প্রোটিনের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে দারুণ কাজ করে। মাত্র এক কাপ পনিরে চব্বিশ গ্রাম প্রোটিন থাকে, যা সকালের নাশতায় রুটি বা অন্যান্য হালকা খাবারের সঙ্গে সহজেই পরিপাকযোগ্য।

 

আবার কাজুবাদামের মাখন কেবল স্বাদের দিক থেকেই অনন্য নয়, এটি প্রোটিন ও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর চর্বির এক অসাধারণ মিশ্রণ। এক কাপ কাজুবাদামের মাখনে সাঁইত্রিশ গ্রামের মতো প্রোটিন থাকে। অন্যদিকে, সামুদ্রিক ও দেশীয় মাছ উন্নতমানের প্রোটিনের অন্যতম প্রধান জোগানদাতা।

 

এক কাপ পরিমাণ রান্না করা চিংড়ি মাছে চব্বিশ গ্রাম প্রোটিন থাকে। তবে পুষ্টিবিদরা সতর্ক করেন যে, চিংড়ি মাছের সঙ্গে প্রায় একশ উননব্বই মিলিগ্রাম কোলেস্টেরলও শরীরে প্রবেশ করে, তাই হৃদরোগের ঝুঁকি এড়াতে এটি পরিমিত মাত্রায় খাওয়া উচিত।

 

সামুদ্রিক মাছের মধ্যে টুনা এবং স্যামন মাছ অত্যন্ত উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এই মাছগুলোতে থাকা প্রোটিন শরীর খুব দ্রুত শোষণ করতে পারে। এছাড়া বাঙালির অতি পরিচিত ও মুখরোচক শুঁটকি মাছও প্রোটিনের এক বিশাল ভাণ্ডার; এক কাপ শুঁটকিতে পনেরো থেকে বিশ গ্রাম প্রোটিন থাকে।

 

তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রাখতে হবে, কারণ বাজারে প্রচলিত শুঁটকিতে অনেক সময় ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ও প্রিজারভেটিভ মেশানো থাকে। তাই বাড়িতে নিজে তৈরি করা শুঁটকি খাওয়াই স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

 

মাংসপ্রেমীদের জন্যও খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের চমৎকার সব উৎস রয়েছে। মুরগির বুকের মাংস প্রোটিনের একটি বিশুদ্ধ ও চর্বিহীন উৎস। হাড়হীন এক কাপ মুরগির বুকের মাংস স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রান্না করলে তা থেকে অন্তত তিরিশ গ্রাম প্রোটিন অনায়াসেই পাওয়া যায়।

 

আর এক কাপ পরিমাণ গরুর মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ সর্বাধিক, যা প্রায় ষাট গ্রামের কাছাকাছি। উচ্চ প্রোটিনের পাশাপাশি গরুর মাংস রক্তে আয়রন ও জিংকের ঘাটতি পূরণেও অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে অতিরিক্ত চর্বি এড়াতে মাংস রান্নার ক্ষেত্রে তেলের ব্যবহার সীমিত রাখা জরুরি।

 

পরিশেষে বলা যায়, শরীর সুস্থ, প্রাণবন্ত ও রোগমুক্ত রাখতে কেবল একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এমন বৈচিত্র্য আনা একান্ত প্রয়োজন। ডিম ছাড়াও আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এই সাধারণ অথচ অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবারগুলো সঠিক ও পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীরের যাবতীয় প্রোটিনের চাহিদা খুব সহজেই পূরণ করা সম্ভব। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য এই উপাদানগুলো আমাদের পরম বন্ধু হতে পারে।