শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুরগির পেটে পাওয়া ডিম খাওয়া কি নিরাপদ? জেনে নিন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম

মুরগির পেটে পাওয়া ডিম খাওয়া কি নিরাপদ? জেনে নিন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত

দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় মুরগির মাংস একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় উপাদান। মুরগি জবাই এবং কাটার সময় প্রায়শই এর পেটের ভেতর সম্পূর্ণ আস্ত কিংবা আধা-গঠিত অপরিপক্ব ডিমের দেখা মেলে। অপ্রত্যাশিতভাবে পাওয়া এই ডিম খাওয়া নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

 

একদল মানুষ আছেন, যারা এটিকে অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার হিসেবে বেশ তৃপ্তি সহকারে রান্না করে খেয়ে থাকেন। অন্যদিকে, অনেকেই এটিকে অস্বাস্থ্যকর মনে করে সরাসরি আবর্জনার পাত্রে ফেলে দেন। এমন পরিস্থিতিতে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন সামনে আসে, এই ডিম খাওয়া কি আসলেই স্বাস্থ্যসম্মত?

 

পুষ্টিবিদ এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যা এই ধরনের ডিম খাওয়ার আগে প্রতিটি সচেতন মানুষের জানা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুরগির পেট থেকে পাওয়া ডিম নিরাপদ কি না, তা মূলত নির্ভর করে সেটি বের করার প্রক্রিয়া এবং ডিমের শারীরিক অবস্থার ওপর।

 

মুরগি কাটার সময় পেটের ভেতরে থাকা ডিমটি যদি পূর্ণাঙ্গ খোলস অথবা একটি পাতলা কিন্তু অটুট আবরণের ভেতরে সুরক্ষিত থাকে, তবে তা খাওয়ার উপযোগী বলে গণ্য করা যায়। তবে ডিমটি পেট থেকে বের করার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।

 

অসাবধানতাবশত যদি ডিমের আবরণ ছিঁড়ে যায় বা ডিমটি ভেঙে মুরগির পেটের ভেতরের অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে মিশে যায়, তবে তা পরিহার করাই ভালো। বিশেষ করে যদি কোনো কারণে পিত্তথলি কিংবা নাড়িভুঁড়ি ফেটে গিয়ে দূষিত বর্জ্য ডিমের গায়ে লেগে যায়, তবে তা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

এ ধরনের বর্জ্য থেকে ডিমে অতি দ্রুত ক্ষতিকর জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে। বর্জ্য মিশ্রিত হয়ে ডিমটি যদি দূষিত হয়ে যায়, তবে স্বাভাবিক আকৃতি অক্ষুণ্ন থাকলেও তা না খাওয়াই চিকিৎসকদের মতে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। এছাড়া ডিম থেকে সামান্য দুর্গন্ধ বের হলেও তা খাওয়ার অযোগ্য বলে ধরে নিতে হবে।

 

এই বিশেষ ডিম পরিষ্কার ও রান্নার ক্ষেত্রেও রয়েছে সুনির্দিষ্ট নিয়ম। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, খোলস বা পাতলা আবরণের ভেতরে থাকা এই ডিম রান্নার পূর্বে সাধারণ ডিমের মতো ধোয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। গায়ে কোনো দৃশ্যমান ময়লা লেগে থাকলে একটি পরিষ্কার টিস্যু পেপার দিয়ে অত্যন্ত আলতোভাবে মুছে নেওয়াই যথেষ্ট।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ডিম ফ্রিজে সংরক্ষণ না করে মুরগি কাটার পরপরই দ্রুত রান্না করে ফেলা উচিত। রান্নার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা কাম্য। ডিমটিকে খুব ভালোভাবে সেদ্ধ করতে হবে। উচ্চ তাপমাত্রায় অল্প সময় রান্না করলে ডিমের বাইরের দিকটা সেদ্ধ হলেও ভেতরটা সম্পূর্ণ কাঁচা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

 

তাই মাঝারি আঁচে পর্যাপ্ত সময় ধরে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে এটি রান্না করতে হবে, যেন ভেতরের অংশ পুরোপুরি জমাট বাঁধে। ডিমটি সেদ্ধ হয়েছে বলে মনে হলেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি ডিম আলাদা পাত্রে তুলে মাঝখান থেকে কেটে পরীক্ষা করা উচিত।

 

ভেতরটা সামান্য নরম থাকলে পুরোপুরি জমাট না বাঁধা পর্যন্ত রান্না চালিয়ে যেতে হবে। রান্নার সময় পাত্রের নিচে যেন পুড়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রেখে সামান্য পানি বা তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে পেট থেকে বের করা এবং যথাযথভাবে রান্না করা ডিম মানবদেহের জন্য সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ। যেকোনো বয়সের সুস্থ মানুষ নিশ্চিন্তে এটি গ্রহণ করতে পারেন। তবে পরিচ্ছন্নতা বা রান্নার তাপমাত্রায় কোনো ধরনের অবহেলা হলে এই ডিমের মাধ্যমে মানবদেহে মারাত্মক জীবাণু সংক্রমণের তীব্র ঝুঁকি থাকে।

 

বিশেষ করে ‘সালমোনেলা’ নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটতে পারে, যা খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ফুড পয়জনিংয়ের অন্যতম কারণ। পুষ্টিগুণের দিক থেকে বিবেচনা করলে মুরগির পেটে থাকা এই অপরিপক্ব ডিম অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর।

 

সঠিক নিয়মে রান্না করে খাওয়া হলে এটি শরীরকে প্রভূত পুষ্টি সরবরাহ করে। এই ডিমে প্রচুর পরিমাণে উন্নতমানের আমিষ, অতি প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, আয়রন এবং ভিটামিন বি-১২ সহ নানা ধরনের অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকে।

 

পুষ্টিগুণে ভরপুর হলেও সকলের জন্য এই ডিম সমানভাবে উপকারী নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক পরিস্থিতিতে এটি খাওয়ার ওপর সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। যাদের শরীরে জটিল রোগের কারণে অতিরিক্ত আমিষ কিংবা আয়রন গ্রহণে চিকিৎসকের বারণ রয়েছে, তাদের দৈনন্দিন নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি ডিম খাদ্যতালিকায় রাখা সমীচীন নয়।

 

এছাড়াও, এই অপরিপক্ব ডিমে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশ উচ্চ থাকে। তাই যেসব ব্যক্তি রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যায় ভুগছেন, ডায়াবেটিস রয়েছে কিংবা যারা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত, তাদের অতিরিক্ত ডিমের কুসুম খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।

 

যাদের এ ধরনের কোনো শারীরিক জটিলতা নেই, তারা চাইলে স্বাস্থ্যকর উপায়ে প্রস্তুত করে এই ডিম খেতে পারেন। পরিশেষে বলা যায়, সচেতনতা এবং সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই যেকোনো খাদ্যের প্রকৃত পুষ্টিগুণ কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই উপভোগ করা সম্ভব।