বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুপুরের খাবারের পর ঘুম বা ‘ফুড কোমা’ কেন হয় এবং তা প্রতিরোধের বিজ্ঞানসম্মত উপায়

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১০ পিএম

দুপুরের খাবারের পর ঘুম বা ‘ফুড কোমা’ কেন হয় এবং তা প্রতিরোধের বিজ্ঞানসম্মত উপায়
ছবি: সংগৃহীত

কর্মব্যস্ত দিনের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষ করে দুপুরের খাবার গ্রহণের পরপরই অনেকের ক্ষেত্রে এক তীব্র ক্লান্তিবোধ ও ঘুম ঘুম ভাব নেমে আসে। কাজের টেবিলে বসে চোখ খোলা রাখাই যেন তখন এক দুঃসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

 

সাধারণ মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি দৈনন্দিন ঘটনা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ফুড কোমা’। হঠাৎ করে শরীর কেন এমন অলস হয়ে পড়ে এবং ভরদুপুরে কেন এই তীব্র তন্দ্রাভাব তৈরি হয়, তা নিয়ে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের নানা সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।

 

এটি মূলত মানবদেহের অভ্যন্তরীণ এক জটিল শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ, যা আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা ও চিকিৎসকদের মতামতের ভিত্তিতে জানা যায়, খাবার গ্রহণের পর শরীরে যে তন্দ্রাভাব বা অলসতা দেখা দেয়, চিকিৎসাশাস্ত্রে তার একটি গালভরা নাম রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘পোস্টপ্রান্ডিয়াল সোমনোলেন্স’।

 

বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. আইলিন ক্যান্ডে এই প্রক্রিয়ার একটি বিস্তারিত ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তার মতে, মানুষ যখন খাবার গ্রহণ করে, তখন পাকস্থলী ও পরিপাকতন্ত্র সেই খাবার হজম করার জন্য এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করে।

 

এই জটিল হজম প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য মানবদেহ প্রাকৃতিকভাবেই একটি বিশ্রামমূলক অবস্থায় চলে যেতে চায়। এই সময়ে অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে নানাবিধ সংকেত প্রেরিত হয়, শরীরের ভেতরে বিভিন্ন হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং রক্তে পুষ্টি উপাদানের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ শুরু হয়।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিপাক প্রক্রিয়ার সময় মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের একটি বিশেষ অংশ, যাকে প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র বলা হয়, তা অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই স্নায়ুতন্ত্র মূলত শরীরকে শিথিল ও শান্ত করার কাজ করে থাকে, যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে মানুষের মধ্যে তীব্র ঘুম ঘুম ভাব তৈরি হয়।

 

সাধারণত ভারী খাবার খাওয়ার এক থেকে দুই ঘণ্টা পর এই শারীরিক ক্লান্তি ও তন্দ্রাভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, দুপুরের এই ঘুমের জন্য কেবল খাবারের পরিমাণই এককভাবে দায়ী নয়। এর নেপথ্যে আরও বেশ কিছু প্রভাবক কাজ করে।

 

আগের রাতে পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম না হওয়া, মানুষের শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান ছন্দের নিজস্ব নিয়ম, শরীরে পানির শূন্যতা তৈরি হওয়া এবং এমন কিছু ওষুধের নিয়মিত সেবন যা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘুম তৈরি করে-এই সমস্ত উপাদান সম্মিলিতভাবে দুপুরের ক্লান্তিবোধকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে।

 

খাবারের পর এই অলসতা সৃষ্টির পেছনে রক্তে শর্করার মাত্রা বা গ্লুকোজের আকস্মিক ওঠানামা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডা. আইলিন ক্যান্ডের মতে, মানুষ যখন দুপুরের খাবারে অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার গ্রহণ করে, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা খুব দ্রুতগতিতে বেড়ে যায়।

 

সাদা ভাত, বিভিন্ন ধরনের পেস্ট্রি, মিষ্টিজাতীয় খাবার এবং চিনিযুক্ত পানীয় হলো পরিশোধিত শর্করার অন্যতম প্রধান উৎস। এই ধরনের খাবার খাওয়ার পর রক্তে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অগ্ন্যাশয় থেকে বিপুল পরিমাণে ইনসুলিন হরমোন নিঃসৃত হয়।

 

অতিরিক্ত ইনসুলিনের প্রভাবে রক্তের এই গ্লুকোজের মাত্রা আবার খুব দ্রুতগতিতে নিচে নেমে যায়। গ্লুকোজের এই আকস্মিক পতনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিঅ্যাকটিভ হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বলা হয়ে থাকে। আর ঠিক এই সময়েই শরীর তার কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং তীব্র ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

 

অন্যদিকে, দুপুরের খাবারে যদি অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত উপাদান থাকে, তবে তা পাকস্থলী থেকে খাবার বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত ধীর করে দেয়, যা পরিপাকতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত বিপাকীয় চাপ সৃষ্টি করে।

 

আবার খাবারে যদি প্রোটিনের মাত্রা অনেক বেশি থাকে, তবে শরীরে ট্রিপটোফ্যান নামক এক বিশেষ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এই ট্রিপটোফ্যান মস্তিষ্কে মেলাটোনিন ও সেরোটোনিন নামক দুটি হরমোন তৈরিতে সরাসরি সহায়তা করে, যা মূলত মানুষের ঘুম চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ঘুম ডেকে আনে।

 

দুপুরের খাবারের পর এই অনাকাঙ্ক্ষিত তন্দ্রাভাব কাটিয়ে উঠে কর্মস্থলে দীর্ঘসময় সতেজ, সতর্ক ও পুরোপুরি কর্মক্ষম থাকার জন্য বিশেষজ্ঞদের কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শস্যজাতীয় খাবার, পরিমিত প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির এক সুষম সমন্বয় থাকা অত্যন্ত জরুরি।

 

একটি সুষম আহার রক্তে শর্করার মাত্রাকে স্থিতিশীল রাখে, ফলে হঠাৎ করে ক্লান্তিবোধ তৈরি হয় না। তবে ডা. আইলিন ক্যান্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, ভারী খাবার খাওয়ার পর সাময়িক ক্লান্তি বা সামান্য তন্দ্রাভাব একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা।

 

এটিকে সঙ্গে সঙ্গেই ডায়াবেটিস বা হাইপোগ্লাইসেমিয়ার মতো কোনো জটিল রোগের লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কিন্তু এই স্বাভাবিকতারও একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।

 

যদি কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে যে, খাবারের পরিমাণ কম হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবার খাবার খাওয়ার পরপরই তিনি এক তীব্র ও অস্বাভাবিক ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছেন, তবে বিষয়টিকে অবশ্যই গভীর সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

 

বিশেষ করে এই অতিরিক্ত ক্লান্তির পাশাপাশি যদি অস্বাভাবিক তৃষ্ণা পাওয়া, কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই শরীরের ওজন দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা এবং কোনো কাজে একেবারেই মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার মতো শারীরিক সমস্যাগুলো নিয়মিত দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

 

চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল উপসর্গগুলোর পেছনে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া অথবা টাইপ-টু ডায়াবেটিসের মতো নীরব ঘাতক রোগের উপস্থিতি থাকতে পারে।

 

এ ছাড়াও, থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যকারিতায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে কিংবা চিকিৎসকের অগোচরে থাকা কোনো জটিল নিদ্রাজনিত সমস্যা বা স্লিপ ডিজঅর্ডার থাকলেও তা খাবার গ্রহণের পর এমন অস্বাভাবিক ও চরম ক্লান্তির কারণ হতে পারে। তাই স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।