চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো আকস্মিক বা কাকতালীয় ঘটনা নয়। যখন কোনো মানুষ দীর্ঘক্ষণ অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তখন তার মাথাব্যথা হওয়ার আশঙ্কা স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাধারণ টেনশন-জনিত মাথাব্যথা এবং মাইগ্রেনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই প্রাত্যহিক মানসিক চাপ। তাছাড়া, মানবদেহে অন্যান্য যেসব শারীরিক বা পারিপার্শ্বিক কারণে মাথাব্যথার সৃষ্টি হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রেও মানসিক চাপ একটি মারাত্মক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এবং ব্যথার তীব্রতা অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন অভিমত হলো, দৈনন্দিন জীবনে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু সহজ, বাস্তবসম্মত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এই যন্ত্রণাদায়ক মাথাব্যথা থেকে অনেকটাই স্থায়ী মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
মানসিক চাপ ও এর থেকে সৃষ্ট মাথাব্যথা প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান উপায় হলো নিজের জন্য প্রতিদিন কিছুটা একান্ত সময় বের করা এবং বিজ্ঞানসম্মত আরামদায়ক বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা। প্রতিদিনের শত ব্যস্ততা এবং রুটিন কাজের মাঝে অন্তত দশ থেকে পনেরো মিনিট সময় একান্তই নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত।
এই সময়ে শ্রুতিমধুর গান শোনা, পছন্দের কোনো বই পড়া, বাগান করা, সামান্য খেলাধুলা করা কিংবা পোষা প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটানোর মতো আনন্দদায়ক কাজগুলো করা যেতে পারে। পাশাপাশি, শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে মানসিক প্রশান্তির একটি অত্যন্ত গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম মাথাব্যথা প্রতিরোধের একটি অত্যন্ত পরীক্ষিত, নিরাপদ ও কার্যকর উপায়। পরিমিত শারীরিক পরিশ্রম দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ চাপ থেকে মস্তিষ্ককে মুক্তি দেয় এবং শরীরে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে। তবে ব্যায়ামের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
শরীরকে মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত না করে হঠাৎ করে কোনো ভারী বা তীব্র ব্যায়াম শুরু করলে মস্তিষ্কের রক্তনালীতে চাপ পড়ে উল্টো মাথাব্যথা শুরু হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে শরীরকে গরম করে বা ওয়ার্ম-আপের মাধ্যমে ব্যায়াম শুরু করা উচিত।
সঠিক ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে প্রায় জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে তাজা ফলমূল, সবুজ শাকসবজি এবং শস্যদানা সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য।
এই প্রাকৃতিক খাবারগুলো শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অফুরন্ত শক্তি জোগায়, যা যেকোনো ধরনের মানসিক চাপ মোকাবিলায় মস্তিষ্ককে সহায়তা করে। অন্যদিকে, ঘুমের অভাব আমাদের শরীরে এক ধরনের তীব্র ও কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করে।
একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ যখন পর্যাপ্ত ঘুমাতে ব্যর্থ হন, তখন তার শরীরে অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসলের মতো ক্ষতিকর স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়। এই হরমোনগুলোর আধিক্য সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মাথাব্যথার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই মানসিক চাপ সামলাতে, পেশিকে শিথিল করতে এবং মস্তিষ্ককে পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম দিতে প্রতিদিন রাতে গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। কর্মক্ষেত্রে বা ব্যক্তিগত জীবনে সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং কাজের চাপ কমানো মাথাব্যথা প্রতিরোধের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
একটি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে নিজের সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজ বা দায়িত্ব ঘাড়ে চাপিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে, দৈনন্দিন করণীয় কাজের তালিকাটি যথাসম্ভব ছোট ও বাস্তবসম্মত রাখা উচিত। নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করতে হবে কোন কাজটি এই মুহূর্তে করা সবচেয়ে বেশি জরুরি, কোনটি কিছুটা সময় পর করলেও চলবে এবং কোনটি একেবারেই পরিহার করা সম্ভব।
কর্মক্ষেত্রে বড় ও জটিল প্রকল্পগুলোকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে নিলে কাজের চাপ অনেকটাই সহনীয় মনে হয়। এছাড়া সবকিছু একা করার আপ্রাণ চেষ্টা না করে, অন্যের সাহায্য নেওয়া বা সহকর্মীদের মাঝে দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়ার সুস্থ মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিদিনের কাজগুলো আগে থেকে গুছিয়ে রাখলে এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিক চাপ অনেকাংশেই এড়ানো যায়। তবে কাজের পরিকল্পনাটি যেন সর্বদা নমনীয় হয়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে; যাতে করে হঠাৎ মাথাব্যথা শুরু হলে দ্রুত কাজের ধরন পরিবর্তন করে বিশ্রাম নেওয়া সম্ভব হয়।
অনেক সময় আমরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করি, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে থাকে। এই ধরনের অনর্থক ও নেতিবাচক চিন্তা পরিহার করে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
নেতিবাচক চিন্তাভাবনাকে ইতিবাচকভাবে বিশ্লেষণ ও গ্রহণ করার অভ্যাস গঠন করলে তা যেকোনো কঠিন বা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় দারুণভাবে সাহায্য করে। মানসিক চাপ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন পরিবারের কোনো বিশ্বস্ত সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু অথবা একজন পেশাদার মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে নিজের মনের কথা ও সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি বা আচরণগত মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং এ ধরনের মানসিক চাপজনিত মাথাব্যথা নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ একটানা কাজের মাঝে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া, কয়েকবার গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া বা মুক্ত বাতাসে একটু হেঁটে আসা মস্তিষ্ককে নতুন করে কর্মোদ্দীপনা জোগায়।
সর্বোপরি, নির্মল হাসি মানসিক চাপ কমানোর একটি দারুণ প্রাকৃতিক ঔষধ হিসেবে কাজ করে। প্রাণখুলে হাসলে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে এন্ডোরফিন নামক একটি উপকারী হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মন ভালো রাখে এবং ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
প্রয়োজনবোধে প্রতিদিনের একঘেয়ে রুটিন থেকে বেরিয়ে এসে ছুটির দিনে কোথাও ভ্রমণ করলে তা জীবনকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে সাহায্য করে এবং মাথাব্যথা থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা প্রদান করে।