শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যেসব গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষণ বলে দেবে আপনার হৃৎপিণ্ড কতটা সুস্থ আছে?

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

যেসব গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষণ বলে দেবে আপনার হৃৎপিণ্ড কতটা সুস্থ আছে?
ছবি: সংগৃহীত

হৃৎপিণ্ড মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি, যার সুস্থতার ওপর সমগ্র শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা নির্ভরশীল। দৈনন্দিন জীবনের বেশ কিছু সাধারণ শারীরিক লক্ষণ বা কার্যকলাপের ধরন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের হৃৎযন্ত্রের ফিটনেস বা সুস্থতার মাত্রা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।

 

যদিও এসব লক্ষণ কোনো চূড়ান্ত ডাক্তারি পরীক্ষার বিকল্প নয়, তবে এগুলো কার্ডিওভাস্কুলার বা রক্তসংবহনতন্ত্রের ফিটনেস সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাথমিক সূত্র প্রদান করে। দৈনন্দিন কার্যকলাপে হঠাৎ কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন, বিশেষ করে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

 

হৃৎপিণ্ডের সুস্থতার অন্যতম প্রধান একটি নির্দেশক হলো অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট ছাড়াই দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম করার সক্ষমতা। একজন মানুষ যদি কোনো অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট ছাড়াই দ্রুতলয়ে হাঁটতে পারেন অথবা কয়েক তলা সিঁড়ি অনায়াসে বেয়ে উঠতে পারেন, তবে এটি সাধারণত নির্দেশ করে যে তাঁর হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস এবং শরীরের অন্যান্য পেশিগুলো একসঙ্গে অত্যন্ত সুসমন্বিতভাবে কাজ করছে।

 

কঠোর বা তীব্র ব্যায়ামের পর কিছুটা শ্বাসকষ্ট হওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু যেসব সাধারণ কাজ আগে খুব সহজেই করা যেত, সেগুলো করতে গিয়ে যদি বর্তমানে অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্টের সম্মুখীন হতে হয়, তবে তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এ ধরনের আকস্মিক শ্বাসকষ্টের পেছনে শারীরিক ফিটনেসের অভাব, রক্তস্বল্পতা, ফুসফুসের জটিলতা অথবা হৃদ্‌রোগের মতো গুরুতর কারণ লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই স্বাভাবিক ফিটনেসের স্তরে যেকোনো ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তনকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।

 

শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের পর হৃৎস্পন্দন কত দ্রুত তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, সেটিও একটি সুস্থ হৃৎপিণ্ডের অন্যতম বড় প্রমাণ। শারীরিক কসরতের সময় পেশিগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তের প্রয়োজন হয় বলে হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।

 

তবে ব্যায়াম বন্ধ করার পরপরই শরীর যখন পুনরায় বিশ্রামের অবস্থায় যায়, তখন হৃৎস্পন্দনও ধীরে ধীরে কমে আসা বা স্বাভাবিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই হৃৎস্পন্দন কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তা মূলত একজন ব্যক্তির ফিটনেসের স্তর, বয়স, ব্যায়ামের তীব্রতা এবং নিয়মিত গ্রহণ করা ওষুধের ওপর নির্ভর করে।

 

স্বনামধন্য চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অব কার্ডিওভাস্কুলার মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ব্যায়ামের পর হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল কার্ডিওভাস্কুলার ফিটনেসের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

 

তাই সার্বক্ষণিক নাড়ি বা পালস পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন না থাকলেও, পরিশ্রমের পর শরীর কত দ্রুত সেরে উঠছে, সেদিকে খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি। অস্বাভাবিক ক্লান্তি ছাড়াই সারাদিন শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে পারা হৃৎযন্ত্রের সুস্থতার আরেকটি বড় লক্ষণ।

 

একটি সুস্থ ও সবল হৃৎপিণ্ড শরীরের প্রতিটি কর্মক্ষম পেশিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহ করতে সক্ষম হয়। এর ফলে কোনো ব্যক্তি যদি অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব না করেই নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা কিংবা দৈনন্দিন অন্যান্য কাজ স্বাচ্ছন্দ্যে চালিয়ে যেতে পারেন, তবে তা হৃৎপিণ্ডের সুস্বাস্থ্যের একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক।

 

বিপরীতে, ক্রমাগত ক্লান্তি বা হঠাৎ করে শারীরিক পরিশ্রম করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টিকে কেবল ব্যস্ত জীবনযাপন বা অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাব ভেবে এড়িয়ে যাওয়া মারাত্মক ভুল হতে পারে। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন যে, হৃদ্‌রোগের ক্ষেত্রে সবসময় বুকে ব্যথার মতো সুস্পষ্ট উপসর্গ প্রকাশ পায় না।

 

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা হঠাৎ করে কাজ করার ক্ষমতা কমে যাওয়া হৃৎপিণ্ডের সমস্যার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

 

নিয়মিত ও রুটিনমাফিক ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও হৃদযন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের প্রমাণ দেয়। ‘ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি’-তে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপের যেসব রোগী নিয়মিত দ্রুতগতিতে এবং বেশি দূরত্ব পর্যন্ত হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখেন, দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

 

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মতে, সুস্থতার জন্য প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার শারীরিক কার্যকলাপ অথবা ৭৫ মিনিট উচ্চ তীব্রতার ব্যায়াম করা উচিত। এর পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার মতো নির্দিষ্ট ব্যায়ামের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

 

এর জন্য পেশাদার ক্রীড়াবিদ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; বরং দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা এবং এমন যেকোনো কাজ যা হৃৎস্পন্দন বাড়ায়, তা এই রুটিনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অস্বস্তি ছাড়াই এমন একটি সক্রিয় রুটিন বজায় রাখতে পারা কার্যকর ফিটনেসের অন্যতম প্রধান শর্ত।

 

সবশেষে, হৃৎপিণ্ডের সুরক্ষায় রক্তচাপ সর্বদা একটি স্বাস্থ্যকর ও স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। কেবল শারীরিক অনুভূতি বা বাহ্যিক লক্ষণ দিয়ে রক্তচাপের সঠিক মাত্রা নির্ণয় করা কখনোই সম্ভব নয়।

 

উচ্চ রক্তচাপের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীরে কোনো সুস্পষ্ট বা দৃশ্যমান লক্ষণ প্রকাশ পায় না, আর ঠিক এই কারণেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে হৃদ্‌রোগের জন্য একটি ‘নীরব ঘাতক’ বা নীরব ঝুঁকির কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

 

তাই শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন। হৃৎপিণ্ড এবং রক্তনালির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য রক্তচাপ ধারাবাহিকভাবে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকা অত্যাবশ্যক। যদি রক্তচাপ মাপার পর বারবার তা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি দেখা যায়, তবে নিজের অনুভূতির ওপর নির্ভর না করে অতি দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।