শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শারীরিক সুস্থতার আয়না নখ, যেসব সূক্ষ্ম পরিবর্তন কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম

শারীরিক সুস্থতার আয়না নখ, যেসব সূক্ষ্ম পরিবর্তন কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়
ছবি : Collected

মানবদেহের সার্বিক সুস্থতার এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো আমাদের হাতের ও পায়ের নখ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, নখ শুধু আমাদের আঙুলের রক্ষাকবচ বা সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়, বরং এটি আমাদের শরীরের ভেতরের স্বাস্থ্যগত অবস্থার এক অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবেও কাজ করে।

 

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নখের স্বাভাবিক রং, আকৃতি, পুরুত্ব বা গঠনগত যেকোনো পরিবর্তন অনেক সময় শরীরে নীরবে বাসা বাঁধা কোনো গুরুতর বা প্রাণঘাতী রোগের প্রথম এবং সুস্পষ্ট পূর্বলক্ষণ হতে পারে।

 

আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে রোগ নির্ণয়ের প্রাথমিক ধাপে চিকিৎসকরা প্রায়ই রোগীর নখের অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। তাই দৈনন্দিন জীবনে নখের যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে কেবল সাধারণ বা সাময়িক সমস্যা ভেবে অবহেলা করা মোটেও উচিত নয়।

 

নখে যদি কোনো ধরনের দৃশ্যমান বা অস্বস্তিকর পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া একান্ত প্রয়োজন। কারণ সঠিক সময়ে রোগের প্রাথমিক লক্ষণটি চিহ্নিত করা গেলে অনেক জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা থেকেই সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

 

নখের বিভিন্ন অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মধ্যে অন্যতম হলো নখে ছোট গর্ত বা খাঁজ সৃষ্টি হওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে নেইল পিটিং বলা হয়। সাধারণত সোরিয়াসিস এবং একজিমার মতো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল চর্মরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নখে এমন পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।

 

ত্বকের এই সমস্যাগুলো শরীরের কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে, যার প্রভাব সরাসরি নখের গঠনের ওপর পড়ে। এছাড়া অ্যালোপেসিয়া অ্যারেটা নামক একধরনের জটিল অটোইমিউন রোগের কারণেও নখে এমন অমসৃণ গর্ত তৈরি হতে পারে।

 

অন্যদিকে, নখ ও আঙুলের ডগা অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যাওয়ার সমস্যাটি চিকিৎসা জগতে নেইল ক্লাবিং নামে সুপরিচিত। এই অবস্থায় আঙুলের ডগা স্ফীত হয়ে যায় এবং নখগুলো আঙুলের ডগার চারপাশ দিয়ে কিছুটা উল্টোভাবে বাঁকানো আকার ধারণ করে।

 

এই মারাত্মক সমস্যাটি রাতারাতি তৈরি হয় না, বরং কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে কম থাকলে, ফুসফুসের জটিল রোগ, জন্মগত হৃদ্‌রোগ, লিভার সিরোসিস এবং পরিপাকতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী গোলযোগের কারণে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

অনেক সময় নখ এতটাই নরম ও দুর্বল হয়ে যায় যে, এর কিনারাগুলো ওপরের দিকে বেঁকে গিয়ে অবিকল একটি চামচের আকার ধারণ করে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এই অবস্থাকে বলা হয় কোইলোনিকিয়া বা চামচ আকৃতির নখ।

 

শরীরে আয়রনের মারাত্মক ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে মূলত নখের আকৃতি এমন চামচের মতো হয়ে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে হিমোক্রোমাটোসিস নামক যকৃতের জিনগত সমস্যার কারণেও এমনটা ঘটতে পারে, যেখানে শরীর সাধারণ খাবার থেকে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত আয়রন শোষণ করে নেয়।

 

নখের আরেক ধরনের অস্বাভাবিকতা হলো টেরির নখ। এই অবস্থায় নখের উপরিভাগে একটি সরু লালচে বা গোলাপি রেখা ছাড়া পুরো নখটাই প্রায় সাদাটে বর্ণ ধারণ করে। বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবেই অনেক বয়স্ক মানুষের এমনটা হতে পারে।

 

তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে এটি যকৃতের মারাত্মক জটিলতা, কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিওর বা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের মতো অত্যন্ত গুরুতর শারীরিক অবস্থার একটি জোরালো লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

নখের ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে বিস্তৃত গভীর খাঁজ বা দাগ দেখা দিলে তাকে বোস লাইন বলা হয়। শরীরে কোনো বড় ধরনের আঘাত, দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ বা গুরুতর অসুস্থতার কারণে নখের স্বাভাবিক বৃদ্ধি সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হলে এই দাগ তৈরি হয়।

 

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হাত ও পায়ে রক্ত চলাচল কমে যাওয়া, উচ্চমাত্রার জ্বরযুক্ত রোগ, শরীরে জিংকের ঘাটতি এবং ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কেমোথেরাপির মতো শক্তিশালী ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও বোস লাইন স্পষ্টভাবে দেখা দিতে পারে।

 

অপরদিকে, অনিকোলাইসিস বা নখের বিচ্ছিন্নতা নামক সমস্যায় নখ তার মূল ভিত্তি বা গোড়া থেকে ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়। এই বিচ্ছিন্ন অংশটি তখন সাদা, হলদেটে বা হালকা সবুজ আভা ধারণ করে অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে।

 

ফাঙ্গাল সংক্রমণ, থাইরয়েডের হরমোনজনিত সমস্যা বা নিম্নমানের রাসায়নিকযুক্ত প্রসাধনীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও নখ আলগা হয়ে যেতে পারে। এছাড়া নখের আরও একটি জটিল অবস্থা হলো হলুদ নখ সিন্ড্রোম। এই সিন্ড্রোমে নখ অস্বাভাবিকভাবে পুরু হয়ে যায় এবং এর বৃদ্ধির হার একেবারেই কমে গিয়ে নখ অস্বাস্থ্যকর হলদেটে বর্ণ ধারণ করে।

 

এই অবস্থায় অনেক সময় নখের চারপাশের চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের মতো শ্বাসযন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং লসিকাতন্ত্রের সমস্যার কারণে হাত-পা ফুলে যাওয়ার রোগ বা লিম্ফেডিমা-এর সুস্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে এই সিন্ড্রোম দেখা দেয়। তাই নখের যেকোনো ধরনের অস্বাভাবিকতাকে নিছক সৌন্দর্যের হানি হিসেবে না দেখে, এর পেছনের অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রতিটি মানুষের জন্য অপরিহার্য।