শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঘন ঘন বদহজম ও জন্ডিস কি অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের পূর্বলক্ষণ? চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

ঘন ঘন বদহজম ও জন্ডিস কি অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের পূর্বলক্ষণ? চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ের ব্যস্ত ও অনিয়মিত জীবনযাত্রায় বদহজম বা অম্বলের মতো সমস্যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক সাধারণ অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাইরের খাবার খাওয়া, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে সামান্য অস্বস্তি হলেই মুঠো মুঠো ওষুধ খেয়ে সাময়িক স্বস্তি খোঁজার প্রবণতা প্রায় প্রতিটি পরিবারেই চোখে পড়ে।

 

তবে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ক্যানসার চিকিৎসকেরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করছেন যে, নিয়মিত বদহজম বা পেটে যন্ত্রণাকে কেবল সাধারণ গ্যাসের সমস্যা ভেবে অবহেলা করাটা চরম বোকামি হতে পারে।

 

বিশেষ করে যদি এই দীর্ঘস্থায়ী বদহজমের সঙ্গে ঘন ঘন জন্ডিসের লক্ষণও শরীরে প্রকাশ পেতে থাকে, তবে তা গভীর উদ্বেগের কারণ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই আপাত-সাধারণ উপসর্গগুলো অনেক ক্ষেত্রেই শরীরের ভেতরে নীরবে বাসা বাঁধা অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াসের ক্যানসারের প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।

 

তাই এই ধরনের শারীরিক অস্বস্তিকে কোনোভাবেই হালকা চালে নেওয়া উচিত নয়, বরং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। এর সবচেয়ে ভয়ংকর ও আক্রমণাত্মক রূপটিকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় ‘প্যানক্রিয়াটিক ডাক্টাল অ্যাডিনোকার্সিনোমা’।

 

এই ধরনের ক্যানসারের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এর প্রাথমিক পর্যায়ে শরীরে এমন কোনো বড় পরিবর্তন বা সুস্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না, যা দেখে রোগী সহজে সতর্ক হতে পারেন। ক্যানসারের কোষগুলো অত্যন্ত সন্তর্পণে এবং রোগীর সম্পূর্ণ অজান্তেই শরীরের ভেতরে বাড়তে থাকে।

 

যখন এই রোগটি অগ্ন্যাশয়ের বাইরে অন্যান্য অঙ্গে ছড়াতে শুরু করে, তখন চিকিৎসকদের পক্ষেও একে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা বা রোগীকে সারিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের ক্ষেত্রে এমন কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়, যেগুলোকে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন ছোটখাটো অসুস্থতা ভেবেই ভুল করে থাকেন।

 

এর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি লক্ষণ হলো বারবার জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়া। কেবল লিভার বা যকৃতের সাধারণ সমস্যার কারণেই যে জন্ডিস হয়, তা নয়; অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হলে পিত্তনালীতে তৈরি হওয়া বাধার কারণে অসংখ্য রোগীর শরীরে জন্ডিসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

 

জন্ডিসের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের সামান্য পরিবর্তনের কারণে হওয়া বদহজমকেও এই ক্যানসারের আরেকটি অন্যতম নীরব সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণ বদহজম সাময়িক হয় এবং অ্যান্টাসিড জাতীয় সাধারণ ওষুধ সেবনে তা খুব দ্রুত সেরেও যায়।

 

তবে সতর্কতার বিষয় হলো, যদি দেখা যায় যে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরেও অম্বল বা বদহজমের সমস্যা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি উপশম মিলছে না, তবে সেটি অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী ও ওষুধে না কমা এই বদহজম অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের একটি জোরালো প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।

 

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের মতো জটিলতা, যার ফলে রোগীর পেটে তীব্র ও অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হয়। এই ব্যথা সাধারণত পেটের উপরিভাগ থেকে শুরু হয়ে ক্রমশ পুরো পেট এবং পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

 

অনেক সময় এই যন্ত্রণার তীব্রতা বুকে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর পাশাপাশি যেকোনো খাবার খাওয়ার পরপরই বমি বমি ভাব বা বমি হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা দেয়, যা রোগীর শারীরিক অবস্থাকে ক্রমশ আরও দুর্বল করে তোলে।

 

চিকিৎসকেরা বিশেষ কিছু শারীরিক অবস্থা ও পূর্ববর্তী স্বাস্থ্যগত ইতিহাসের ভিত্তিতে অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের উচ্চ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। যাদের শরীরে অতিরিক্ত মেদ রয়েছে বা যারা মাত্রাতিরিক্ত স্থূলতার সমস্যায় ভুগছেন, তাদের এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

 

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ এবং কোলন বা বৃহদন্ত্রের জটিল সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদেরও জীবনযাপনে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যেসব রোগীর অতীতে পাকস্থলী অথবা পিত্তথলিতে কোনো ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও এই ক্যানসারের একটি সুপ্ত ঝুঁকি থেকে যায়।

 

একইসঙ্গে পিত্তথলিতে বারবার পাথর জমার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বা সেই সংক্রান্ত ক্রনিক জটিলতা থাকলে, তাদেরও অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের বিষয়ে যথেষ্ট সাবধান হতে হবে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্যে থাকতে হবে।

 

অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের কোষগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রাখে। তাই একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে বা গোড়াতেই যদি রোগটি নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা না যায়, তবে তা রোগীর জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

 

সাধারণ বদহজম বা বারবার জন্ডিস হওয়াকে নিছক শারীরিক দুর্বলতা বা আবহাওয়ার পরিবর্তন ভেবে অবহেলা না করে, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করা অপরিহার্য। শরীরের যেকোনো অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমেই কেবল এই ভয়ংকর ব্যাধির হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব। জীবনযাপনের কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি সচেতনতা ও প্রারম্ভিক রোগ নির্ণয়ই হতে পারে এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।