রাতের দীর্ঘ ঘুমের পর মানুষের পাকস্থলী সাধারণত সম্পূর্ণ খালি থাকে। এই সময়ে শরীর অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতে, সকালে খালি পেটে না বুঝে করা কিছু সাধারণ অভ্যাস আমাদের পরিপাকতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র এবং সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের শুরুটা হওয়া উচিত অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং স্বাস্থ্যসম্মত। সুস্থ জীবনের জন্য সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাস এড়িয়ে চলা একান্ত প্রয়োজন।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ ধোঁয়া ওঠা পানীয় ছাড়া অনেকেরই যেন দিন শুরু হতে চায় না। কিন্তু খালি পেটে চা বা কফি পানের এই বহুল প্রচলিত অভ্যাসটি স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও অনুকূল নয়। দীর্ঘ সময় পেট খালি থাকার কারণে পাকস্থলীতে প্রাকৃতিকভাবেই একধরনের অম্ল তৈরি হয়।
এর ওপর খালি পেটে উত্তেজক উপাদানসমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণ করলে পাকস্থলীতে অম্লতার মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এর ফলে বুকজ্বালা, হজমের গোলযোগ, পেট ফাঁপা এবং দীর্ঘমেয়াদে আলসারের মতো জটিল রোগ বাসা বাঁধতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হলো ঘুম থেকে ওঠার পর পরিমিত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা। এটি শরীরের ভেতর থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দিতে সাহায্য করে। এক গ্লাস পানি ও হালকা কোনো খাবার গ্রহণের পরই কেবল চা বা কফি পান করা নিরাপদ।
অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনো কিছু না খেয়েই চিকিৎসকের পরামর্শ বা সাধারণ নিয়মের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন ধরনের ঔষধ সেবন করেন। বিশেষ করে ব্যথানাশক কিংবা শক্তিশালী জীবাণুনাশক ঔষধ খালি পেটে সেবন করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ঔষধের রাসায়নিক উপাদানগুলো সরাসরি খালি পাকস্থলীর সংস্পর্শে এলে পেটের ভেতরের স্তরে তীব্র জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে রক্তচাপের অস্বাভাবিক তারতম্য, পাকস্থলীর আলসার এমনকি অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই চিকিৎসকদের সর্বজনীন পরামর্শ হলো, অত্যন্ত জরুরি কোনো নির্দেশনা না থাকলে অবশ্যই সকালে হালকা নাশতা করার পর ঔষধ সেবন করা উচিত। ওজন কমানোর তীব্র বাসনা থেকে অনেকেই সকালে খালি পেটে দীর্ঘক্ষণ শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করেন। অনেকেই মনে করেন, না খেয়ে ব্যায়াম করলে হয়তো দ্রুত মেদ ঝরবে।
কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। রাতের দীর্ঘ উপবাসের পর শরীরে শক্তির বড় ধরনের ঘাটতি থাকে। এই অবস্থায় ভারী কায়িক শ্রম বা ব্যায়াম করলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে। ফলে শরীর চরম দুর্বল হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরানো কিংবা হঠাৎ জ্ঞান হারানোর মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
শরীরচর্চার মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখা। তাই ব্যায়াম শুরু করার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে একটি কলা, কয়েকটি কাঠবাদাম বা শক্তিবর্ধক কোনো হালকা খাবার খেয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এতে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পায় এবং ব্যায়ামের পূর্ণাঙ্গ সুফল পাওয়া যায়।
সকালের নাশতায় ফলের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যকর। তবে খালি পেটে টকজাতীয় ফল বা দই খাওয়া পরিপাকতন্ত্রের জন্য বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। লেবু, কমলা, মাল্টা বা আনারসের মতো অম্লযুক্ত ফল খালি পেটে খেলে পাকস্থলীতে স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
একইভাবে, অনেকেই স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে সকালে কেবল কাঁচা সবজির মিশ্রণ খেয়ে থাকেন। কাঁচা সবজিতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে, যা খালি পেটে হজম করা পাকস্থলীর জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে পেট ব্যথা বা বদহজম হতে পারে।
পুষ্টিবিদরা পরামর্শ দেন, সকালে ফল বা সবজি খেতে হলে তা অন্যান্য আমিষজাতীয় বা শর্করাজাতীয় খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়া উচিত। খালি পেটে নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণের পরিণতি সবচেয়ে বেশি মারাত্মক। সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে ধূমপান করলে তামাকের বিষাক্ত উপাদানগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে রক্তের সঙ্গে মিশে যায়।
এর ফলে হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়। অন্যদিকে, খালি পেটে মদ্যপানের অভ্যাস যকৃতের ওপর অকল্পনীয় চাপ সৃষ্টি করে। এমনিতেই নেশাজাতীয় দ্রব্য শরীরের জন্য ক্ষতিকর, আর খালি পেটে এসব গ্রহণ করলে ক্ষতির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা অকালমৃত্যুর ঝুঁকি পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
খাদ্যাভ্যাসের বাইরেও আধুনিক জীবনের আরেকটি ক্ষতিকর দিক হলো সকালে চোখ মেলেই মুঠোফোন বা কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রাখা। অনেকেই ঘুম থেকে উঠে বিছানায় শুয়েই অফিসের কাজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মগ্ন হয়ে পড়েন।
রাতের বিশ্রামের পর মস্তিষ্ক ও চোখ পুনরায় সচল হওয়ার জন্য কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। ঘুম থেকে উঠেই উজ্জ্বল পর্দার দিকে তাকিয়ে কাজ শুরু করলে চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে এবং মানসিক অবসাদ তৈরি হয়।
এর ফলে সারা দিন কাজে মনোযোগের ঘাটতি এবং মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে। তাই ঘুম থেকে ওঠার পর অন্তত কিছুক্ষণ বৈদ্যুতিক পর্দা থেকে দূরে থেকে প্রকৃতির আলো-বাতাস উপভোগ করা, পানি পান করা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে দিন শুরু করা একটি আদর্শ ও সুন্দর জীবনের পূর্বশর্ত।