চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতে, এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি শরীরের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে। অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে শরীর শুধু দুর্বলই হয় না, বরং ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও সতেজতা হারিয়ে যায়। ত্বক হয়ে পড়ে শুষ্ক, কালচে ও প্রাণহীন।
তাই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, শরীরকে কষ্ট দিয়ে বা খাবার পুরোপুরি বন্ধ করে নয়, বরং দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এমন কিছু পুষ্টিকর উপাদানের সমন্বয় ঘটাতে হবে, যা একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ওজন কমাতে সাহায্য করবে, তেমনি ত্বকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও লাবণ্য ধরে রাখতেও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
দিনের শুরুটা হওয়া উচিত শরীরকে সতেজ করার মধ্য দিয়ে। এ ক্ষেত্রে শসা ও লেবুর সংমিশ্রণে তৈরি পানীয় একটি চমৎকার ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে। শসাতে প্রচুর পরিমাণে জলীয় অংশ থাকে এবং এর খাদ্যশক্তি বা ক্যালরির পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য।
ফলে এটি শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি শরীর থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দিতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, লেবুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, যা মানবদেহে কোলাজেন নামের প্রোটিন তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই কোলাজেন ত্বকের টানটান ভাব বজায় রাখে এবং বলিরেখা পড়তে দেয় না। সকালে এই পানীয়টি পানের অভ্যাস শরীরকে সতেজ রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে।
সকালের প্রধান খাবারে টক দই অন্তর্ভুক্ত করা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ একটি পদক্ষেপ। টক দইয়ে থাকা উপকারী জীবাণু বা প্রোবায়োটিক আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে এবং হজমশক্তির উন্নতি ঘটায়।
পাশাপাশি এটি একটি চমৎকার প্রোটিনের উৎস, যা খাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি দেয়। এর ফলে বারবার ক্ষুধা লাগা বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ত্বকের যত্নেও টক দইয়ের জুড়ি মেলা ভার।
এতে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড ত্বকের মৃত কোষ দূর করে এবং ত্বকের ভেতরের ময়লা পরিষ্কার করে প্রাকৃতিক লাবণ্য ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিনের পানীয়ের তালিকায় সাধারণ চা বা কফির বদলে এক বা দুই কাপ সবুজ চা যুক্ত করা যেতে পারে।
সবুজ চায়ে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে জারণ-রোধী উপাদান বা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া বৃদ্ধি করে দ্রুত ক্যালরি পোড়াতে সাহায্য করে। এই পানীয়টি শরীরের ভেতরের ক্লান্তি ও মানসিক চাপ কমাতেও কার্যকর।
নিয়মিত সবুজ চা পানের অভ্যাস শরীরের দূষিত পদার্থগুলো বের করে দেয়, যার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের ত্বকের ওপর। ফলে ত্বক দেখায় আরও সতেজ ও প্রাণবন্ত। ওজন নিয়ন্ত্রণের যাত্রায় তিসির বীজ এবং চিয়া বীজ হতে পারে দারুণ সহায়ক। এই উভয় ধরনের বীজেই রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যআঁশ এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি।
এগুলো পানিতে ভিজিয়ে রাখলে ফুলে ওঠে এবং খাওয়ার পর তা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরতি থাকার অনুভূতি প্রদান করে। ফলে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা কমে আসে। শুধু ওজন কমানোই নয়, এই বীজগুলোতে থাকা ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
এটি ত্বকের ভেতরের আর্দ্রতা ধরে রাখে, শুষ্কতা দূর করে এবং ভেতর থেকে একটি কোমল ও মসৃণ ভাব ফুটিয়ে তোলে। দুপুরের বা রাতের খাবারে কম ক্যালরিযুক্ত সবজি হিসেবে গাজর এবং টমেটো সালাদ বা স্যুপের মাধ্যমে গ্রহণ করা অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর।
গাজরে থাকা বিটা-ক্যারোটিন এবং টমেটোতে উপস্থিত লাইকোপেন শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এই পুষ্টি উপাদানগুলো সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষা প্রদান করে।
নিয়মিত এই সবজিগুলো খেলে ত্বকের কালচে দাগ দূর হয় এবং বয়সের ছাপ সহজে পড়তে পারে না। পেট ভরে এই সবজিগুলো খেলেও ওজন বাড়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না। বিকেলের হালকা ক্ষুধায় অনেকেই অস্বাস্থ্যকর ও তেলে ভাজা খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা ওজন বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
এই ভাজাপোড়া খাবারের বদলে এক মুঠো কাঠবাদাম বা আখরোট খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। এই বাদামগুলোতে রয়েছে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, প্রোটিন এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র পুষ্টি উপাদান। বিশেষ করে কাঠবাদামে থাকা ভিটামিন ই ত্বকের কোষগুলোকে পুনর্গঠন করতে সাহায্য করে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে।
স্বাস্থ্যকর এই নাশতা পেট ভরানোর পাশাপাশি শরীরের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করে। পরিশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, শুধুমাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট খাবার খাদ্যতালিকায় যুক্ত করলেই রাতারাতি মেদ ঝরে যাবে না। একটি সুস্থ ও সুন্দর শরীরের জন্য সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা অপরিহার্য।
ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রতিদিনের মোট ক্যালরি গ্রহণের হিসাব, নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার, প্রক্রিয়াজাত ময়দা এবং ডুবো তেলে ভাজা খাবার খাদ্যতালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া বা এর পরিমাণ কমিয়ে আনা জরুরি।
নিয়ম করে পর্যাপ্ত পানি পান এবং দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন শরীরের পাশাপাশি ত্বকের সৌন্দর্য রক্ষায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। তাই উৎসব বা যেকোনো আয়োজনের আগে না খেয়ে থাকার অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি পরিহার করে পরিমিত, পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণের মাধ্যমে সুস্থতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।