চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য গবেষকরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করে বলছেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক নড়াচড়াহীন অবস্থায় বসে থাকা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি বিষয়। যখন আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকি, তখন আমাদের শরীর স্বাভাবিক হাঁটাচলা বা দাঁড়িয়ে থাকার তুলনায় অনেক কম শক্তি খরচ করে।
দৈনন্দিন শক্তি খরচের এই বিশাল ঘাটতি এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা মানবদেহে এমন কিছু নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণাগুলোর তথ্যমতে, এই অতিরিক্ত সময় বসে থাকার সঙ্গে স্থূলতা বা অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধির অত্যন্ত সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে মানবদেহে বিপাকীয় নানা জটিলতা বা পরিপাকতন্ত্রের মারাত্মক সব অবস্থার উদ্ভব ঘটে। একটানা বসে থাকার ফলে শরীরে রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, যা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
একইসঙ্গে পেটের চারপাশে ও কোমরে অতিরিক্ত ক্ষতিকর চর্বি জমা হওয়া এবং রক্তে দূষিত চর্বির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার মতো জটিলতাগুলো মূলত শারীরিক নড়াচড়ার অভাবেই ঘটে থাকে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই বিপাকীয় সমস্যাগুলো কেবল দৈনন্দিন অস্বস্তিই বাড়ায় না, বরং এটি মানুষের হৃদরোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বাহ্যিকভাবে বসে থাকাকে একটি বিশ্রামদায়ক অবস্থা মনে হলেও, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি শরীরের ভেতরে ধীরগতির এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে থাকে। এই বিষয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচালিত তেরোটি পৃথক গবেষণার উপাত্ত নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা একটি যুগান্তকারী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।
প্রায় দশ লক্ষাধিক মানুষের দৈনন্দিন বসে থাকার সময় এবং শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে এই বিশদ পর্যালোচনাটি সম্পন্ন করা হয়। গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, যারা কোনো ধরনের শারীরিক কার্যকলাপ বা ব্যায়াম ছাড়াই প্রতিদিন আট ঘণ্টার বেশি সময় একটানা বসে কাটান, তাদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি একজন নিয়মিত ধূমপায়ী কিংবা চরম স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুঝুঁকির প্রায় সমান।
এই ভয়ংকর তথ্যটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে এই ভয়াবহ ঝুঁকির বিপরীতে আশার কথাও শুনিয়েছেন গবেষকরা। তারা প্রমাণ পেয়েছেন যে, প্রতিদিন যদি অন্তত ষাট থেকে পঁচাত্তর মিনিট মাঝারি মাত্রার হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিকারী পরিশ্রমসাধ্য ব্যায়াম করা যায়, তবে তা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার এই ক্ষতিকর প্রভাবকে অনেকাংশেই প্রশমিত করতে সক্ষম।
অন্যান্য বেশ কিছু চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায় এটিও সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, যেসব মানুষ দৈনন্দিন জীবনে শারীরিকভাবে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে সৃষ্ট মৃত্যুঝুঁকির নেতিবাচক প্রভাব একেবারেই সামান্য।
তাই চিকিৎসকদের সর্বসম্মত পরামর্শ হলো, সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে দৈনন্দিন বসার সময় কমিয়ে এনে শারীরিক নড়াচড়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সূচনা করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।
কর্মক্ষেত্রে বা বাড়িতে একটানা বসে না থেকে প্রতি আধা ঘণ্টা অন্তর বসার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটের ছোট একটি বিরতি নেওয়ার মাধ্যমে এই ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু করা যেতে পারে। যারা নিয়মিত কাজের টেবিলে বসে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেন, তারা মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে কাজ করার উপযোগী বিশেষ উঁচু টেবিল ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারেন।
যদিও কেবল দাঁড়িয়ে থাকা অতিরিক্ত বসে থাকার ঝুঁকি কমাতে ঠিক কতটা কার্যকর, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো গবেষণা চলমান রয়েছে, তবে একটানা বসে থাকার চেয়ে এটি তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর একটি বিকল্প।
অফিসের প্রথাগত আবদ্ধ সভাকক্ষে বসে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করার পরিবর্তে সহকর্মীদের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে আলোচনা সম্পন্ন করার নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। উন্নত বিশ্বের অনেক স্বাস্থ্যসচেতন কার্যালয়ে এখন কাজের টেবিলের নিচে হাঁটার যন্ত্র স্থাপন করে নেওয়ার চল শুরু হয়েছে।
এর ফলে গণনযন্ত্রের পর্দায় বা নথিপত্রে কাজ করার পাশাপাশি শরীরকে একটি নির্দিষ্ট গতিতে সচল রাখা সম্ভব হয়। যেকোনো ধরনের ছোট শারীরিক নড়াচড়াও স্বাস্থ্যের ওপর জাদুকরী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
যখন মানুষ বেশি নড়াচড়া করে, তখন শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত শক্তি বা ক্যালরি ক্ষয় হয়, যার ফলে শরীরের ওজন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমে আসে এবং প্রাত্যহিক কর্মশক্তি বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ পেশি সুগঠিত করতে সাহায্য করে এবং মানসিক প্রশান্তি ও স্নায়বিক সুস্থতা বজায় রাখে।
বিশেষ করে মানুষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শরীরকে সুস্থ, সতেজ ও কর্মক্ষম রাখতে বসার পরিমাণ কমিয়ে দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানোর এই অভ্যাসটি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।