চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময় দৃশ্যমান ও সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই মানুষের জীবনে অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে।
অনিদ্রার পেছনে থাকা পারিপার্শ্বিক অনেক প্রভাবক মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও, দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত অভ্যাসের নিয়মিত অনুশীলন একটি নিরবচ্ছিন্ন ও স্বাস্থ্যকর ঘুম নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো ঘুমের একটি নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক সময়সূচি কঠোরভাবে মেনে চলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শারীরিক ও মানসিক পুনরুদ্ধারের জন্য দৈনিক অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম অপরিহার্য।
তবে সুস্থতার জন্য আট ঘণ্টার বেশি সময় বিছানায় কাটানোর কোনো প্রয়োজন নেই। সপ্তাহের ছুটির দিনসহ প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বা ঘুম ও জাগরণের চক্রকে শক্তিশালী করে তোলে।
যদি বিছানায় যাওয়ার বিশ মিনিটের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে ঘুম না আসে, তবে জোর করে শুয়ে থেকে মানসিক চাপ না বাড়িয়ে সাময়িকভাবে উঠে গিয়ে বই পড়া বা শান্তিদায়ক কোনো কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর শরীরে ক্লান্তি অনুভূত হলে পুনরায় বিছানায় ফিরে যাওয়া উচিত।
পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের জন্য দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস এবং পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য। পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, একেবারে ক্ষুধার্ত অবস্থায় কিংবা অতিরিক্ত পেট ভরা অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়া কখনোই উচিত নয়।
বিশেষ করে ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে ভারী, চর্বিযুক্ত বা অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা স্বাস্থ্যকর ঘুমের অন্যতম প্রধান শর্ত। কারণ এ ধরনের খাবার পরিপাকতন্ত্রে অস্বস্তি তৈরি করে ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। পাশাপাশি, স্নায়ুকে উদ্দীপ্ত করে এমন উপাদান, যেমন তামাকজাত দ্রব্য ও অতিরিক্ত চা-কফি গ্রহণের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
এসবে থাকা স্নায়ু উত্তেজক উপাদানের প্রভাব শরীর থেকে পুরোপুরি দূর হতে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, যা স্বাভাবিক ঘুমের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া, অনেকেই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে মনে করেন যে মদ্যপান দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে; কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এটি প্রাথমিক পর্যায়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব আনলেও রাতের মধ্যভাগে ঘুমের ধারাবাহিকতা পুরোপুরি নষ্ট করে দেয় এবং গভীর ঘুমের স্তরকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
প্রশান্তিদায়ক ঘুমের জন্য শোবার ঘরের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। একটি পরিমিত ঠান্ডা, অন্ধকার ও কোলাহলমুক্ত শান্ত ঘর নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। সন্ধ্যায় অতিরিক্ত বা তীব্র আলোর সংস্পর্শে এলে মানুষের মস্তিষ্কে ঘুমের সহায়ক হরমোন নিঃসরণ কমে যায়, ফলে ঘুমিয়ে পড়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ঘুমানোর ঠিক আগে দীর্ঘক্ষণ ধরে মুঠোফোন, কম্পিউটার বা অন্য যেকোনো আলোকিত পর্দা ব্যবহার করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এসব যন্ত্র থেকে নির্গত আলো মস্তিষ্ককে দিনের বেলার সংকেত দেয়।
পরিবেশকে নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী আরামদায়ক করতে কক্ষ অন্ধকার করার ভারি পর্দা, কানে শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক পাখা বা অন্যান্য সহায়ক যন্ত্রপাতির ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
এছাড়া ঘুমানোর আগে হালকা গরম পানিতে গোসল করা, ধীরলয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা ধ্যান করার মতো শান্তিদায়ক অভ্যাসগুলো স্নায়ুকে দ্রুত শিথিল করে ঘুমিয়ে পড়তে দারুণভাবে সহায়তা করে।
রাতের বেলার ঘুমের মান উন্নত ও নিরবচ্ছিন্ন করতে দিনের বেলার ঘুমের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত রাখা প্রয়োজন। দিনের বেলা দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে তা রাতের স্বাভাবিক ঘুমের চক্রকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
তাই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ হলো, দিনের বেলা কোনোভাবেই এক ঘণ্টার বেশি না ঘুমানো এবং বিশেষ করে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে ঘুম পুরোপুরি এড়িয়ে চলা। তবে যারা রাতের পালায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন, তাদের ক্ষেত্রে কাজের আগে কিছুটা ঘুমিয়ে নেওয়া স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর হিসেবেই বিবেচিত হয়।
শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা ভালো ঘুমের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। প্রতিদিন নিয়ম করে শারীরিক কসরত করা এবং কিছুটা সময় বাইরের প্রাকৃতিক ও মুক্ত বাতাসে কাটানো ঘুমের মানকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
তবে ঘুমানোর ঠিক আগমুহূর্তে ভারী ব্যায়াম বা অতিরিক্ত শারীরিক সক্রিয়তা পরিহার করা উচিত, কারণ এটি শরীরের তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে দিয়ে ঘুম আসতে দেরি করিয়ে দেয়। সবশেষে, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ স্বাস্থ্যকর ঘুমের জন্য অত্যাবশ্যক।
ঘুমানোর আগে সারাদিনের দুশ্চিন্তাগুলো সমাধান করার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। মনের মধ্যে থাকা অবদমিত উদ্বেগ বা আগামীকালের অবশ্য করণীয় কাজগুলো একটি দিনলিপিতে লিখে রাখলে মস্তিষ্ক অনেক বেশি চাপমুক্ত হয়। এই ছোট অথচ অত্যন্ত কার্যকর অভ্যাসটি স্নায়বিক চাপ কমিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের জন্য মস্তিষ্ককে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত করে তোলে।