শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা ও বার্ধক্যের ঝুঁকি জানতে ঘরে বসেই করুন ৩০ সেকেন্ডের ‘চেয়ার টেস্ট’

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম

হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা ও বার্ধক্যের ঝুঁকি জানতে ঘরে বসেই করুন ৩০ সেকেন্ডের ‘চেয়ার টেস্ট’
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাত্রায় বয়স বাড়ার আগেই শরীর বুড়িয়ে যাচ্ছে কি না অথবা হৃদ্‌যন্ত্র নীরবে অকেজো হয়ে পড়ছে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের উদ্বেগের শেষ নেই। বাইরে থেকে দেখে একজন মানুষকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হলেও, শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা বোঝা বেশ কঠিন।

 

অনেকেই নিয়মিত অফিসে যাচ্ছেন, দৈনন্দিন কাজ করছেন এবং স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখছেন, কিন্তু বয়সের তুলনায় শরীরের ভেতরের কলকব্জার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকছেন।

 

এই নীরব শারীরিক অবনতি বা হৃদ্‌যন্ত্রের বয়স বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সহজে শনাক্ত করার জন্য আমেরিকার বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ বা সিডিসি একটি অত্যন্ত সহজ ও কার্যকর পদ্ধতির কথা প্রকাশ্যে এনেছে।

 

রক্তপরীক্ষা বা দামি কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগেই ঘরে বসে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের একটি সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমে যে কেউ নিজের শরীরের ফিটনেস এবং হৃদ্‌যন্ত্রের অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন। সিডিসি উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্টেডি চেয়ার টেস্ট’।

 

এই পরীক্ষায় প্রাপ্ত স্কোরের ওপর ভিত্তি করে একজন ব্যক্তি সহজেই বুঝতে পারবেন তার শারীরিক সক্ষমতা কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং তার পেশি বা হৃদ্‌যন্ত্র ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে কি না। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই পরীক্ষার জন্য কোনো বিশেষ যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই, কেবল একটি সাধারণ চেয়ার এবং একটি ঘড়ি হলেই চলে।

 

পরীক্ষাটি করার জন্য প্রথমেই এমন একটি স্থান বেছে নিতে হবে, যেখানে একটি দেয়াল রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে চেয়ারটি দেয়ালের সঙ্গে এমনভাবে সেঁটে রাখতে হবে, যাতে ওঠাবসা করার সময় সেটি কোনোভাবেই পিছলে বা সরে না যায়।

 

এরপর পরীক্ষার্থীকে মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ সোজা রেখে, সামনের দিকে না ঝুঁকে চেয়ারের ঠিক মাঝখানে বসতে হবে। এ সময় শ্বাসপ্রশ্বাস একেবারে স্বাভাবিক রাখতে হবে। বসার পর শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বাঁ হাত দিয়ে ডান কাঁধ এবং ডান হাত দিয়ে বাঁ কাঁধ স্পর্শ করে রাখতে হবে।

 

হাত দুটি আড়াআড়িভাবে বুকের ওপর রাখা অবস্থায়, চেয়ারের হাতল বা অন্য কোনো কিছুর সাহায্য না নিয়েই পরীক্ষার্থীকে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে এবং পুনরায় বসতে হবে। এভাবে সম্পূর্ণ ভারসাম্য বজায় রেখে ঘড়ি ধরে ঠিক ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে যতবার সম্ভব নির্ভুলভাবে ওঠাবসা করতে হবে।

 

এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একজন ব্যক্তি কতবার সম্পূর্ণভাবে উঠে দাঁড়াতে এবং বসতে পারছেন, মূলত তার ওপর ভিত্তি করেই এই পরীক্ষার চূড়ান্ত স্কোর নির্ধারণ করা হয়। স্কোর যত বেশি হবে, বুঝতে হবে বয়সের তুলনায় শরীর ততটাই সতেজ ও রোগমুক্ত রয়েছে এবং তলে তলে কোনো জটিল অসুখ শরীরে বাসা বাঁধতে পারেনি।

 

সিডিসির নির্দেশিকা অনুযায়ী, বয়সের ভিন্নতার কারণে এই পরীক্ষার আদর্শ স্কোরেও তারতম্য রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সুস্থ ও স্বাভাবিক যুবকদের ক্ষেত্রে ৩০ সেকেন্ডে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ বার ওঠাবসা করার সক্ষমতা থাকা উচিত।

 

যদি এই বয়সী কেউ উল্লেখিত মাত্রায় ওঠাবসা করতে সফল হন, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাপকাঠিতে তার শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। এর অর্থ হলো, তার শরীরের নিম্নাঙ্গের পেশির জোর অটুট রয়েছে এবং হৃদ্‌যন্ত্রও অত্যন্ত কার্যকরভাবে রক্ত সঞ্চালনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

অন্যদিকে, চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই শারীরিক সক্ষমতার কিছুটা স্বাভাবিক অবনতি ঘটে। চল্লিশ পেরোলে এই পরীক্ষায় পুরুষদের জন্য আদর্শ স্কোর ধরা হয় ২০ থেকে ২৫ এবং নারীদের ক্ষেত্রে তা ১৮ থেকে ২০ হওয়া বাঞ্ছনীয়। যদি কারও স্কোর এই নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়, তবে তাকে সতর্ক হতে হবে।

 

এটি মূলত শরীরের নিম্নাঙ্গের পেশির শক্তি কমে যাওয়া এবং সামগ্রিক শারীরিক দুর্বলতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। শুধু তা-ই নয়, এই সামান্য ওঠাবসা করার সময়েই যদি কারও অস্বাভাবিক মাত্রায় শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তবে তা ফুসফুসের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।

 

পাশাপাশি, যদি হৃৎস্পন্দন মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যায়, তবে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হৃদ্‌যন্ত্রের বিস্তারিত পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। বয়োজ্যেষ্ঠদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ণয়ের বিষয়টি আরও বেশি সংবেদনশীল।

 

সিডিসি জানাচ্ছে, ৬০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী পুরুষদের জন্য এই পরীক্ষায় ন্যূনতম স্কোর হওয়া উচিত ১৪ এবং একই বয়সী নারীদের জন্য ১২ বা তার বেশি। বয়স যখন ৬৫ থেকে ৭৫ বছরের কোঠায় পৌঁছায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের শারীরিক কাঠামো এবং পেশির সহনশীলতা কমে আসে।

 

এই বয়সের পুরুষদের ক্ষেত্রে ১২ বার এবং নারীদের ক্ষেত্রে অন্তত ১০ বার ওঠাবসা করার সক্ষমতাকে সন্তোষজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ কোনো ব্যক্তি যদি এই ন্যূনতম স্কোরটুকুও অর্জন করতে ব্যর্থ হন, তবে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সেটি অত্যন্ত দুর্বল হৃদ্‌যন্ত্র এবং ভঙ্গুর শারীরিক অবস্থার একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।

 

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের এই ধরনের পরিবর্তনগুলোকে স্বাভাবিক বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং এই সাধারণ চেয়ার পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বা আকস্মিক হৃদ্‌রোগের হাত থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।