রবিবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পেটের পীড়া থেকে দ্রুত আরোগ্যে চিকিৎসকদের প্রস্তাবিত তিন খাবার এবং বর্জনীয় খাদ্যাভ্যাস

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম

পেটের পীড়া থেকে দ্রুত আরোগ্যে চিকিৎসকদের প্রস্তাবিত তিন খাবার এবং বর্জনীয় খাদ্যাভ্যাস
ছবি : Collected

দৈনন্দিন জীবনে পেটের সমস্যা বা হজমের গোলযোগে ভোগেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ঋতুপরিবর্তন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবাণুর সংক্রমণে পাকস্থলীর স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায়শই বাধাগ্রস্ত হয়।

 

তবে অসুস্থতার চরম পর্যায় পার হওয়ার পর শরীর যখন ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগোতে থাকে এবং হারানো ক্ষুধা পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করে, তখন অধিকাংশ মানুষই এক ধরনের মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন।

 

একদিকে শরীরের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে ক্ষুধা অনুভূত হয়, অন্যদিকে এই ভয়ও কাজ করে যে ভুল কোনো খাবার খেলে পরিস্থিতি হয়তো আবারও আগের মতো খারাপ হয়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতে, এই স্পর্শকাতর সময়ে পাকস্থলীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খাবার নির্বাচন করা প্রয়োজন।

 

বিশেষজ্ঞরা এমন পরিস্থিতিতে মূলত তিনটি অত্যন্ত সহজপাচ্য ও আরামদায়ক খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যা শুধু পাকস্থলীকেই শান্ত করে না, বরং শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করতে সহায়তা করে।

 

সেরে ওঠার এই প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞদের নির্দেশিত সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভালোভাবে সেদ্ধ করা আপেল অথবা নাশপাতি। এই ফলগুলো খাওয়ার নিয়মটিও অত্যন্ত সাধারণ।

 

প্রথমে আপেল বা নাশপাতি ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিতে হবে এবং এরপর ফুটন্ত পানিতে অন্তত দশ থেকে পনেরো মিনিট সময় নিয়ে ভালোভাবে সেদ্ধ করতে হবে, যেন তা সম্পূর্ণ নরম হয়ে যায়। সেদ্ধ করার পর ব্যক্তি তার নিজস্ব রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী এটি হালকা গরম অবস্থায় অথবা ঠান্ডা করে খেতে পারেন।

 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সেদ্ধ ফলে প্রচুর পরিমাণে পেকটিন নামক এক বিশেষ ধরনের দ্রবণীয় আঁশ বা ফাইবার থাকে, যা হজমপ্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং ক্লান্ত পাকস্থলীকে শান্ত করতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে।

 

শুধু তা-ই নয়, এই পুষ্টি উপাদান ধীরে ধীরে রোগীর রুচি ও ক্ষুধা ফিরিয়ে আনতেও দারুণভাবে কার্যকর। পাশাপাশি আপেল বা নাশপাতিতে থাকা পলিফেনল এবং ফলের নিজস্ব প্রাকৃতিক মিষ্টি স্বাদ অসুস্থতাজনিত শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি রোগীর বিষণ্ণ মনকে সতেজ ও প্রফুল্ল করতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

 

অসুস্থ পাকস্থলীকে সুস্থ করে তোলার এই যাত্রায় পুষ্টিবিদদের প্রস্তাবিত দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদানটি হলো টক দই এবং ঘোল বা মাঠা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, দই এবং ঘোলে অগণিত উপকারী ব্যাকটেরিয়া বিদ্যমান থাকে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরাসরি কাজ করে।

 

যখন কোনো ব্যক্তি দীর্ঘক্ষণ পেট ফাঁপা, বুকজ্বালা বা অম্লাধিক্য এবং হজমের সাধারণ অস্বস্তিতে ভোগেন, তখন এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো পাকস্থলীর ভেতরের পরিবেশকে শান্ত করে এবং পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

 

অনেক সময় দেখা যায়, পেটের সমস্যার কারণে রোগীর শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয় এবং এর পাশাপাশি মনমরা ভাব, শারীরিক দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা হালকা সর্দি-কাশির মতো আনুষঙ্গিক উপসর্গও প্রকাশ পায়।

 

এমন জটিল পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা দই অথবা ঘোলের সঙ্গে সামান্য পরিমাণ লবণ ভালোভাবে মিশিয়ে পান করার বিশেষ পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যা শরীরে প্রয়োজনীয় লবণের ঘাটতি পূরণ করে এবং দ্রুত শক্তি জোগাতে সহায়তা করে।

 

এই তালিকার তৃতীয় এবং আমাদের দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও আরামদায়ক খাবারটি হলো ভাত। পেটের যেকোনো অসুস্থতায় ভাত একটি অত্যন্ত নিরাপদ ও সহজপাচ্য বিকল্প হিসেবে যুগ যুগ ধরে সমাদৃত হয়ে আসছে।

 

বিশেষজ্ঞরা জানান, সুস্থতার এই পর্যায়ে ভাতকে নানাভাবে প্রস্তুত করে খাওয়া যেতে পারে। যেমন, ভাতের সঙ্গে সামান্য লবণ ও গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে পর্যাপ্ত পানিতে ভালোভাবে সেদ্ধ করে ভাতের স্যুপ বা পাতলা মাড় হিসেবে গ্রহণ করা পাকস্থলীর জন্য অত্যন্ত উপকারী।

 

এছাড়া রোগীর রুচি অনুযায়ী অত্যন্ত সাধারণ উপায়ে রান্না করা ডাল-ভাত, পাতলা খিচুড়ি অথবা শুধুমাত্র সামান্য লবণ ও সামান্য পরিমাণ খাঁটি ঘি দিয়ে গরম ভাত মেখে খাওয়া যেতে পারে।

 

পুষ্টিগুণের দিক থেকে এগুলো অত্যন্ত হালকা এবং পরিপাকতন্ত্র কোনো ধরনের অতিরিক্ত চাপ ছাড়াই খুব সহজে এই খাবারগুলো হজম করতে সক্ষম হয়, যা রোগীকে দ্রুত সেরে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে থাকে।

 

পেটের গোলযোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কিছু নির্দিষ্ট খাবার গ্রহণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকাও সমানভাবে জরুরি। পুষ্টিবিদরা কঠোরভাবে সতর্ক করেন যে, এই সময়ে যেকোনো ধরনের প্যাকেটজাত ও কৃত্রিম উপায়ে প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে।

 

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাজারের কেনা শীতল ও কোমল পানীয়, নানা ধরনের ভাজাভুজি, চকোলেট, প্যাকেটজাত ফলের রস, কৃত্রিম শক্তিবর্ধক পানীয় এবং ক্যাফেইন বা কফি যুক্ত যেকোনো ধরনের পানীয়। এগুলো পাকস্থলীর ভেতরের আস্তরণে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।

 

এছাড়া অসুস্থতার পর প্রথম আটচল্লিশ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে যেকোনো ধরনের পনির, ডিম এবং মাছ-মাংসের মতো ভারী আমিষ জাতীয় খাবার গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকি এই সময়ে কাঁচা সবজিও খাওয়া উচিত নয়, কারণ কাঁচা সবজি হজম করা দুর্বল পাকস্থলীর জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।

 

পরিশেষে বলা যায়, পাকস্থলী যখন ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরে পেতে শুরু করে, তখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সহজ, সাধারণ ও হালকা খাবার গ্রহণ করলে তা যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক অস্বস্তি ও জটিলতা এড়াতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।