তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিদদের গবেষণায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যতালিকা থেকে প্রিয় খাবারগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে একটি অতি ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত কার্যকর কৌশল অবলম্বন করলেই রক্তে শর্করার মাত্রা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই বিশেষ পদ্ধতিটিকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি যুগান্তকারী উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মূলত প্লেটে থাকা খাবারগুলো যথেচ্ছভাবে বা এলোমেলোভাবে গ্রহণ না করে, একটি নির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক ক্রম অনুসরণ করে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই হলো এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি।
খাদ্য গ্রহণের এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ফুড সিকোয়েন্সিং’ বা খাবার গ্রহণের সঠিক ক্রম বলা হয়। পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রতিদিনের মূল আহার গ্রহণের সময় থালায় পরিবেশিত খাবারগুলো তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে পর্যায়ক্রমিকভাবে গ্রহণ করা উচিত।
প্রথম ধাপে একজন ব্যক্তিকে প্রচুর পরিমাণে আঁশ বা ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে, যার প্রধান উৎস হলো বিভিন্ন ধরনের সবুজ শাকসবজি ও তাজা সালাদ। শাকসবজি খাওয়ার পর্বটি ভালোভাবে শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে নজর দিতে হবে প্রোটিন বা আমিষ এবং স্বাস্থ্যকর স্নেহপদার্থ বা ফ্যাটের দিকে।
এই ধাপে মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, বাদাম বা পনিরের মতো পুষ্টিগুণে ভরপুর প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারগুলো গ্রহণ করতে হবে। প্রোটিন ও ফ্যাট গ্রহণের পর সবশেষে তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপে ভাত, রুটি, আলু কিংবা অন্যান্য শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, খাওয়ার এই সহজ, ধারাবাহিক ও সুশৃঙ্খল ক্রমটি অনুসরণ করলে খাবার গ্রহণের পরপরই রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ার যে সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়, তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
এই পদ্ধতিটি ঠিক কীভাবে মানবদেহে কাজ করে, তা বিশ্লেষণ করলে পরিপাকতন্ত্রের একটি চমৎকার বিজ্ঞানসম্মত চিত্র ফুটে ওঠে। খাওয়ার শুরুতেই যদি ভাত, পাউরুটি বা অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণ করা হয়, তবে তা মানুষের পাকস্থলীতে খুব দ্রুত হজম হয়ে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়।
এর ফলে খাবার গ্রহণের পরপরই রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে ও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'সুগার স্পাইক' বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এর পরিবর্তে যখন খাওয়ার শুরুতে ফাইবারসমৃদ্ধ শাকসবজি এবং এরপর প্রোটিন ও ফ্যাট গ্রহণ করা হয়, তখন পরিপাকতন্ত্রের সার্বিক হজমপ্রক্রিয়া এবং শর্করা শোষণের গতি প্রাকৃতিকভাবেই অনেকটা ধীর হয়ে আসে।
শাকসবজি ও প্রোটিন প্রথমে গ্রহণ করার ফলে পাকস্থলী থেকে খাদ্য উপাদানগুলো অন্ত্রে প্রবেশ করার প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হয়। ফাইবার পরিপাকতন্ত্রে একটি আস্তরণ তৈরি করে, ফলে শর্করাজাতীয় খাবার থেকে উৎপন্ন গ্লুকোজ একসঙ্গে বিশাল মাত্রায় রক্তে প্রবেশ করতে পারে না।
বরং তা ধাপে ধাপে ও অত্যন্ত ধীরগতিতে রক্তে শোষিত হওয়ার সুযোগ পায়, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখতে মানবদেহের অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন হরমোনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তে যখন গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তখন শরীর তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন নিঃসরণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। শর্করাজাতীয় খাবার আগে খাওয়ার ফলে যখন গ্লুকোজ খুব দ্রুত রক্তে মিশে যায়, তখন শরীরকেও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয় এবং বিপুল পরিমাণে ইনসুলিন তৈরি করতে হয়।
এটি অগ্ন্যাশয়ের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু খাবারের ক্রম পরিবর্তন করে যদি গ্লুকোজকে ধীরে ধীরে রক্তে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়, তবে শরীরে ইনসুলিন নিঃসরণের মাত্রাও একটি স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে।
এর ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের বা ইনসুলিন অকার্যকারিতার ঝুঁকি কমে যায় এবং মানুষ দীর্ঘমেয়াদে বিপাকীয় রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকে। খাওয়ার পর শরীর ভারী লাগা বা ক্লান্তিবোধ হওয়ার যে সমস্যা দেখা যায়, শর্করার ধীর শোষণের ফলে সেটিও দূর হয় এবং শরীরে দীর্ঘক্ষণ কর্মশক্তি বজায় থাকে।
শারীরিক সুস্থতার এই চমৎকার কৌশলটি শুধু ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যই নয়, বরং যারা শরীরের অতিরিক্ত ওজন স্বাস্থ্যকর উপায়ে কমাতে চাইছেন, তাদের জন্যও সমানভাবে ফলপ্রসূ। বিশ্বের খ্যাতনামা পুষ্টিবিদেরা ওজন কমানোর বিজ্ঞানসম্মত ডায়েট চার্টে খাওয়ার ঠিক শুরুতেই এক বাটি সালাদ বা শাকসবজি খাওয়ার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে থাকেন।
ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার শুরুতে খেলে তা পাকস্থলীকে দীর্ঘক্ষণ পূর্ণ রাখে, মস্তিষ্ককে তৃপ্তির সংকেত পাঠায়, ফলে পরবর্তীতে অতিরিক্ত শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণের প্রবণতা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কমে যায়। পরিশেষে বলা যায়, খাবারের সাথে রক্তে শর্করার ওঠানামার সম্পর্কটি কেবল একজন মানুষ সারাদিনে কতটা শর্করা গ্রহণ করছেন, তার ওপরই নির্ভর করে না।
বরং সেই একই খাবার কোন ক্রমে বা কোন পদ্ধতিতে খাওয়া হচ্ছে, পরিপাকতন্ত্রের ওপর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকে। তাই কোনো প্রিয় খাবার তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার মানসিক যন্ত্রণায় না ভুগে, কেবল খাদ্য গ্রহণের সঠিক ক্রম অনুসরণের মাধ্যমেই একটি সুস্থ, সুন্দর ও ডায়াবেটিসমুক্ত জীবনযাপন করা পুরোপুরি সম্ভব।