বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসার পরও কেন বারবার ফিরে আসে পাইলস এবং এর পেছনের অজানা কারণগুলো

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৫ এএম

চিকিৎসার পরও কেন বারবার ফিরে আসে পাইলস এবং এর পেছনের অজানা কারণগুলো
ছবি: সংগৃহীত

পাইলস বা অর্শ রোগের সফল চিকিৎসার পর রক্তপাত বন্ধ হওয়া, মলত্যাগ সহজ হওয়া এবং সার্বিক অস্বস্তি কমে যাওয়ার মাধ্যমে রোগীরা এক অনাবিল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তবে কয়েক মাস বা বছর পেরোনোর পর যখন ঠিক একই যন্ত্রণাদায়ক উপসর্গগুলো পুনরায় উঁকি দিতে শুরু করে, তখন স্বভাবতই রোগীর মনে প্রশ্ন জাগে- চিকিৎসা করা সত্ত্বেও পাইলস কেন ফিরে এলো?

 

মূল কারণের অসম্পূর্ণ সমাধান পাইলস ফিরে আসার অন্যতম প্রধান একটি বৈজ্ঞানিক কারণ। চিকিৎসকরা সাধারণত অস্ত্রোপচার বা ওষুধের মাধ্যমে ফুলে যাওয়া টিস্যু বা শিরাগুলোর চিকিৎসা করে থাকেন, কিন্তু ঠিক যে অভ্যাসের কারণে এই সমস্যাটি তৈরি হয়েছিল, তার সমাধান না হলে রোগটি পুনরায় ফিরে আসাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

 

উদাহরণস্বরূপ, দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত মলত্যাগের সময় মলদ্বারে অতিরিক্ত মাত্রায় চাপ প্রয়োগ করতে হয়। ২০২২ সালে বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা বিষয়ক ডাটাবেস ‘পাবমেড’-এ প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা বা সিস্টেমেটিক রিভিউতে দেখা গেছে যে, সাধারণ সুস্থ মানুষের তুলনায় হেমোরয়েড বা পাইলসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কার্যকরী কোষ্ঠকাঠিন্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে অনেক বেশি।

 

গবেষকরা তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে মলদ্বারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ চাপের প্রমাণ পেয়েছেন। তারা তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের যথাযথ চিকিৎসা এবং বিশেষ করে পেলভিক ফ্লোরের পেশিগুলোর সমন্বয়হীনতার সমস্যা দূর করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে পাইলস ফিরে আসার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

 

পুরোনো শৌচাগারের অভ্যাসে ফিরে যাওয়া রোগটি পুনরায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে একটি নীরব অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। চিকিৎসা চলাকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রেখে রোগীরা সাধারণত তাদের দৈনন্দিন রুটিনে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আনেন।

 

তারা চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করেন, খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার রাখেন এবং শৌচাগারে কম সময় ব্যয় করেন। কিন্তু একবার উপসর্গগুলো পুরোপুরি চলে গেলে, বেশিরভাগ রোগীই ধীরে ধীরে তাদের সেই পুরোনো অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসে ফিরে যান।

 

অপর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, ফাইবারবিহীন প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ এবং কাজের চাপে মলত্যাগের তাগিদ চেপে রাখার মতো বদভ্যাসগুলো পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। এর পাশাপাশি, আধুনিক যুগে শৌচাগারে স্মার্টফোন নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে অকারণে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার প্রবণতা এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

 

২০২৫ সালে চিকিৎসা সাময়িকী ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সার্জারি’-তে ৫৮০ জন ব্যক্তির ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় মলদ্বারের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে টয়লেটে বসে থাকার প্রবণতা অনেক বেশি।

 

দীর্ঘক্ষণ কমোডে বসে থাকলে মলদ্বারের চারপাশের শিরাগুলোতে মাধ্যাকর্ষণজনিত চাপ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি নতুন করে পাইলস সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করে। আক্রান্ত টিস্যুর সম্পূর্ণ অপসারণ না হওয়া অনেক সময় পাইলস ফিরে আসার একটি ক্লিনিক্যাল কারণ হতে পারে।

 

রোগীরা প্রায়শই ধরে নেন যে, আধুনিক চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সমস্ত আক্রান্ত স্থান বা টিস্যু পুরোপুরি অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু মানবদেহের জটিল কাঠামোর কারণে সব চিকিৎসা পদ্ধতি সবসময় শতভাগ নিখুঁতভাবে কাজ নাও করতে পারে।

 

পাইলসের আকার, সংখ্যা এবং চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে অনেক সময় শিরাগুলোর অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিছু টিস্যু থেকে যেতে পারে। এই অবশিষ্ট টিস্যুগুলো পরবর্তীতে শারীরিক চাপের কারণে পুনরায় ফুলে গিয়ে নতুন করে রক্তপাত বা উপসর্গের সৃষ্টি করতে পারে।

 

তাই চিকিৎসার পর তুলনামূলকভাবে খুব দ্রুত যদি উপসর্গগুলো ফিরে আসে, তবে নতুন করে পাইলস তৈরি হয়েছে বলে হতাশ না হয়ে দ্রুত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের মাধ্যমে সেই স্থানটি পুনরায় পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

 

পারিপার্শ্বিক শারীরিক চাপ পাইলস ফিরে আসার পেছনে এক অদৃশ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র মলত্যাগের বদভ্যাসই এই সমস্যার একমাত্র কারণ নয়। শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাজনিত দীর্ঘস্থায়ী কাশি, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন বা স্থূলতা, গর্ভাবস্থা, নিয়মিত ভারী জিনিস তোলা এবং কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকার মতো বিষয়গুলো মলদ্বারের চারপাশের শিরাগুলোতে ক্রমাগত অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

 

যদি এই কারণগুলোর মধ্যে অন্তত একটিও রোগীর দৈনন্দিন জীবনে অব্যাহত থাকে, তবে শুধুমাত্র পাইলসের চিকিৎসা করলেই সমস্যার জন্য দায়ী সকল অনুঘটক দূর হয় না। এই কারণেই রোগটি পুনরায় দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে জীবনযাপনের ধরন নিয়ে খোলামেলা ও বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন, যাতে ঠিক কোন কারণে মলদ্বারে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

 

নতুন লক্ষণগুলোর ভিন্নতা পাইলসের চিকিৎসায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়, যা সাধারণ মানুষ খুব সহজেই এড়িয়ে যান। যদি কোনো ব্যক্তির আগে পাইলস হয়ে থাকে, তবে প্রতিবার মলদ্বারে সামান্য রক্তপাত, ব্যথা বা ফোলাভাব দেখা দিলেই সেটিকে পাইলসের নতুন প্রকোপ বলে ধরে নেওয়াটা মানুষের একটি সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা।

 

কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, মলদ্বারের অন্যান্য জটিল রোগও ঠিক একই ধরনের লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। অ্যানাল ফিশার, ফিস্টুলা, পলিফ বা কোলন ক্যানসারের মতো মারাত্মক মলদ্বার-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোতেও রক্তপাত, ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। তাই নতুন লক্ষণগুলো আসলেই পাইলস কি না, তা নিশ্চিত হতে পেশাদার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে সঠিক রোগ নির্ণয় করা ছাড়া সুস্থ থাকার কোনো বিকল্প নেই।